নির্বাচন ব্যবস্থার ইতিকথা প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন

নির্বাচন ব্যবস্থা বা ভোট প্রদানের ধারণাটি দীর্ঘ ইতিহাস ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের আধুনিক রূপ লাভ করেছে। মানুষ যখন সংঘবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করে, তখন থেকেই নেতা নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। আধুনিক বিশ্বে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয় ত্রয়োদশ শতকে ইংল্যান্ডে সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। ১৬৯৪ সালে ট্রিনিয়্যাল অ্যাক্ট ও ১৭১৬ সালের সেপ্টেনিয়্যাল অ্যাক্টের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ লাভ করে।

১৮৭২ সালে গোপনে ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদানের পদ্ধতি প্রণীত হয়। ১৯২৮ সালে সর্বজনীন ভোটাধিকার নীতি গ্রহণ করা হয়। প্রাচীন পাত্র বা পাথর থেকে শুরু করে ব্যালট বাক্স, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM), বায়োমেট্রিক ভোটার আইডি থেকে শুরু করে আজকের দিনে ব্লকচেইনভিত্তিক ভোটিং সিস্টেম—নির্বাচনের প্রযুক্তিগত দিকেও এসেছে বিপ্লব।

অস্ট্রাসিজম: প্রাচীনকালে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকার যদি স্বৈরাচারী বা ক্ষতিকর হয়ে উঠতো তাকে অস্ট্রাসিজম নামক পদ্ধতিতে অপসারণ করা হতো। প্রতি বছর এথেন্সের অ্যাসেম্বলি বা সাধারণ সভায় নাগরিকরা সিদ্ধান্ত নিতেন যে সেই বছর কোনো অস্ট্রাসিজম হবে কি না। যদি ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত হতো, তবে নাগরিকরা একটি মাটির পাত্রের টুকরোতে সেই ব্যক্তির নাম লিখতেন যাকে তারা নির্বাসিত করতে চান। যদি মোট ভোটের সংখ্যা ৬,০০০-এর বেশি হতো এবং যার নামে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়ত তাকে ১০ বছরের জন্য শহর ছাড়তে হতো। নির্বাসিত ব্যক্তিকে শহর ছাড়ার জন্য ১০ দিন সময় দেওয়া হতো । তবে তার সম্পত্তি বা নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হতো না এবং ১০ বছর পর তিনি সসম্মানে ফিরে আসতে পারতেন। থেমিস্টোক্লিস নামক এথেনীয় শাসক পারস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বীরত্ব দেখালেও অতিরিক্ত প্রভাবশালী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠায় তাকে অস্ট্রাসিজম প্রক্রিয়ায় নির্বাসিত করা হয়েছিল।

ভোট দানের বয়স: বাংলাদেশে একজন ভোটারের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর। ভারতীয় আইন বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘ল ফোর এর মতে , ১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধানে ভোট দেওয়ার বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল ২১ বছর। ১৯৮৮ সালে এক সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সেটি কমিয়ে আনা হয় ১৮ বছরে। দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেকটোরাল সিস্টেমসের (আইএফইএস) তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে ১৮ বছর বয়সে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান বিষয়ক সচেতনতা তৈরির প্ল্যাটফর্ম ‘ন্যাশনাল কনস্টিটিউশন সেন্টারেএর তথ্য মতে, দেশটিতে ১৯৭১ সালের আগে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারকে ২১ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। ১৯৭১ সালে ২৬তম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সে বয়সসীমা কমিয়ে ১৮ বছর করা হয়। ১৬ বছর বয়সে যে সব দেশে ভোট দেয়া যায় সেগুলো হলো- ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, কিউবা, নিকারাগুয়া। ইউরোপের দেশ হিসেবে প্রথম ভোট দেওয়ার বয়স ১৬ বছর করেছে অস্ট্রিয়া। ১৭ বছর বয়সে যেসব দেশের নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সেগুলো হলো- উত্তর কোরিয়া, গ্রিস ও ইন্দোনেশিয়া। ১৯ বছর বয়সে ভোটাধিকার আছে সলোমন দ্বীপপুঞ্জে। তাইওয়ান, ক্যামেরুন, বাহরাইন ও নাউরুতে ভোটাধিকারের বয়স ২০ বছর।

নারীর ভোটাধিকার: নারীর ভোটাধিকার একটি দীর্ঘ আন্দোলনের ফল। গোপন ব্যালট পদ্ধতির নির্বাচন ব্যবস্থা প্রচলনের পর পুরুষই একমাত্র ভোট প্রদানের অধিকার পায়। ১৮৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সেনেকা ফলস সম্মেলনে নারীরা ভোটাধিকারের প্রথম সংগঠিত দাবি তোলে।নিউজিল্যান্ড ১৮৯৩ সালে সর্বপ্রথম নারীর ভোট প্রদানের অধিকার নিশ্চিত করে । পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে রাশিয়া, ১৯১৮ সালে ইংল্যান্ড ও জার্মানি, ১৯২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ১৯৪৪ সালে ফ্রান্স নারী ভোটাধিকার নিশ্চিত করে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে নারীদের ভোটাধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের সংবিধানে নারী ও পুরুষের সমান ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পর্যায়ক্রমে ওমানে ১৯৯৭ সালে, কাতারে ১৯৯৯ সালে, বাহরাইনে ২০০২ সালে নারীর ভোটাধিকার প্রদান করা হয়। সবশেষে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবের নারীরা প্রথমবারের মতো পৌরসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। বিশ্বের প্রায় সব দেশে নারীর ভোটাধিকার নিশ্চিত হলেও রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান কেন্দ্র ভ্যাটিকান সিটিতে নারীদের এখনও কোন ভোটাধিকার নেই। নারীর ভোটাধিকার আন্দোলনে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তারা হলেন এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন, সুসান বি. অ্যান্থনি এবং এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট (যুক্তরাজ্য।

নির্বাচনী প্রতীক : আঠারোশ শতকে গাধা ও হাতিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান রাজনৈতিক দল দুটোর প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয় করাতে ভূমিকা রাখা একজন কার্টুনিস্টের নাম টমাস ন্যাস্ট। তিনি ছিলেন হারপার উইকলি নামে একটি পত্রিকার কার্টুনিস্ট। সাপ্তাহিক এই পত্রিকাটি কার্টুনের মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের এমনভাবে উপস্থাপন করত যা আপাতদৃষ্টিতে অশ্লীল বা নোংরা মনে হতো। ১৮৭৪ সালে থমাস ন্যাস্ট হাতিকে রিপাবলিকানদের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি তার কার্টুনে দেখান, সিংহের চামড়া পিঠে চাপিয়ে একটি গাধা বনের সব প্রাণীকে ভয় দেখাচ্ছে। সিংহের ছদ্মবেশে থাকা সেই গাধাকে দেখে সবাই ভয়ে পালাচ্ছে। কিন্তু সবাই ভয়ে পালালেও বনে একটি হাতি স্থির ও অচঞ্চল গাধাটির সামনে। হাতির এই নির্ভীক বিষয়টাই প্রতিকী অর্থে তুলে ধরেন কার্টুনশিল্পী। এভাবে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বাহন দুটি আস্তে আস্তে পরিচিত হয়ে ওঠে। এর পর থেকে হাতি রিপাবলিকানদের কাছে মূল প্রতীকরূপে দাঁড়ায়। ডেমোক্র্যাটদের কাছে গাধা পরিশ্রমী, অধ্যাবসায়ী এবং কষ্টসহিষ্ণুতার প্রতীক। অপর দিকে রিপাবলিকানদের কাছে হাতি নির্ভীকতা, মর্যাদাশীল এবং স্থিতিশীলতার প্রতীক।

গিলগ্যামেশ প্রবেলেম তত্ত্ব : বিশ্বব্যাপী এবং গণতান্ত্রিক যাত্রার শুরু থেকে নির্বাচন অবাধ,সুষ্ঠূ ও নিরপেক্ষ হওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। গবেষকদের মতে, বিশ্বের প্রাচীনতম সাহিত্যিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয় ‘গিলগামেশ মহাকাব্য’ (The Epic of Gilgamesh)-কে। এই মহাকাব্যে বর্ণনা করা আছে কিভাবে জনগণ তাদের নিজেদের সুখ ,শান্তি আর সমৃদ্ধি থেকে বঞ্চিত হয়েছে।গিলগ্যামেশ ছিলেন উরুকের (বর্তমানে ইরাকের) রাজা। ভয়ংকর শারীরিক শক্তির অধিকারী রাজা গিলগ্যামেশ ছিলেন অত্যাচারী, স্বেচ্ছাচারী এমনকি ‘ক্রমিক ধর্ষক’। স্বাভাবিকভাবেই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে রাজ্যের প্রজারা, ইশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেনে। ইশ্বর প্রার্থনা মজ্ঞুর করে গিলগ্যামেশকে শাস্তি দেয়ার জন্য দেবতাদেরকে একজন শক্তিশালী মানবকে যাচাই বাছাই করে নির্বাচিত করতে বলেন। দেবতারা এনদিকু নামে একজন শক্তিশালী মানবকে নির্বাচিত করে গিলগামেশকে দমন করতে নির্দেশ প্রদান করেন। মূল উদ্দেশ্য এনদিকু গিলগামেশকে পরাজিত করে শাস্তি দেবে এবং প্রজারা শান্তিতে থাকবে। গিলগামেশ আর এনকিদুর দেখা হওয়ার পর দূ’জনের মধ্যে প্রচন্ড সংঘর্ষ হয়।যুদ্ধে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় না এবং স্বাভাবিকভাবেই দুই মহাশক্তিধর প্রতিপক্ষ তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ করে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে দু’জন হয়ে ওঠেন দারুণ বাস্তববাদী। তারা মনে করেন এভাবে সংঘাত না করে যদি দুজনই এক হয়ে যায় তাহলে তারা হবে অপ্রতিরোধ্য শক্তিশালী এবং তাদেরকে ঠেকানোর মতো শক্তি কারও নেই। যে পরিকল্পনা নিয়ে দেবতারা এনকিদুকে সৃষ্টি করেছিলেন, সেটি মাঠে মারা যায়। জনগণের ওপর অত্যাচার আর নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। এ নির্মম বাস্তবতাই পৃথিবীর ইতিহাসে গিলগ্যামেশ প্রবেলেম নামে পরিচিত।বিখ্যাত বই Why nation fails এর লেখকদ্বয় Daron Acemoglu এবং James A. Robinson তাঁদের সাম্প্রতিকতম বই The Narrow Corridor : States, Societies and the Fate of Liberty গ্রন্থে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার এক নতুন প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে দেখা যাচ্ছে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে সেপারেশন অব পাওয়ার নিশ্চিত করার পরও সেখানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো অনেক ক্ষেত্রেই তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্বে শৈথিল্য এনে একে অপরকে ছাড় দিতে শুরু করেছে। এটাকেই তাঁরা নাম দিয়েছেন ‘গিলগামেশ প্রবলেম’। ‘এপিক অব গিলগ্যামেশে এনকিদুরের দায়িত্ব ছিল অত্যাচারী গিলগ্যামেশকে মোকাবেলা করে জনগণকে শান্তিতে রাখা। কিন্তু এনকিদু গিলগ্যামেশকে ছাড় দিতে শুরু করে আর গিলগ্যামেশও মূল তত্ত্ব বুঝে যায়। ফলে ন্যায় –অন্যায় সংঘাতের পরিবর্তে আপোষ ফর্মূলায় চলার সিদ্ধান্ত নেয়। যার ফলে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে যায় যা প্রজাদের জন্য নিদারুন কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।১৭৭৬ সালে রচিত এডওয়ার্ড গিবনের বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য ডেক্লাইন এন্ড ফল অব দ্যা রোমান এমপায়ার এ বলেছেন একজন মানুষের অহংকারের তৃপ্তির জন্য বহু মানুষের আত্ম সমর্পণের প্রয়োজন হয় যাতে শান্তি বিনষ্ট হয়। গৃহ কলহের বিশৃঙ্খলায় সমাজের আইনগুলোর কার্য্কারিতা হারায় এবং মানবতার আইন তাদের খুবই কম স্থান করে নিতে পারে। পৃথিবীর যে কোন নির্বাচনে বিজয়ী পক্ষের ভেতর যদি ঐক্য বা মিলনের সুর বেজে না ওঠে তাহলে বিভক্ত জাতি এগিয়ে যেতে পারে না।

লেখক: অধ্যক্ষ,কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ,কুড়িগ্রাম।

Share With