কুড়িগ্রাম জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের ত্রি-বার্ষিক নির্বাচন ঘিরে আদালতের স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করে নির্বাচন আয়োজনের তোড়জোড়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে আদালতের আদেশ গোপন করা এবং মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা পরিচালনা থেকে সরে দাঁড়ানোর আবেদনে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও মামলার বিবাদী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট বজলুর রশিদের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় মামলার বাদী ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী শ্রমিক নেতা মোস্তফা কামাল বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগগুলো তুলে ধরেন এবং কথিত সাজানো নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।
মোস্তফা কামাল বলেন, কুড়িগ্রাম জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের ত্রি-বার্ষিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটার তালিকায় সহস্রাধিক ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শ্রমিক ইউনিয়নের গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে ‘পিংকি বাচ্চু’ নৈশ কোচের মালিক বাচ্চু মিয়াকে শ্রমিক হিসেবে ভোটার করা হয়েছে। এমনকি তিনি মালিক হয়েও শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অ্যাডভোকেট মানিক চন্দ্র বর্মণের মাধ্যমে কুড়িগ্রাম যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতে মোকদ্দমা নম্বর ৪২/২৬ দায়ের করা হয়।
মামলার শুনানি শেষে আদালত নির্বাচন কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেন এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ছয় সদস্যকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে কেন অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে না, সে বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেন। বাদীপক্ষের দাবি, আদালতের নোটিশ জারিকারী ২ নম্বর বিবাদী অ্যাডভোকেট সামছুল হক সরকার ও ৩ নম্বর বিবাদী পিপি অ্যাডভোকেট বজলুর রশিদের কাছে নোটিশ নিয়ে গেলে তারা তা গ্রহণ করেননি।
মোস্তফা কামালের অভিযোগ, এরপর কয়েকজন ব্যক্তি তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মানিক চন্দ্র বর্মণকে জোরপূর্বক পিপি বজলুর রশিদের কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার আবেদনে স্বাক্ষর করানো হয়। পরে তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং হুমকি দিয়ে তাকে আদালত চত্বর থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সদর থানাকে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মোস্তফা কামাল বলেন, “যেখানে আদালতের আদেশ উপেক্ষিত হয়, সেখানে ন্যায়বিচার কিভাবে পাবো। তাই সাংবাদিকদের মাধ্যমে দেশবাসী ও সরকারকে বিষয়টি অবহিত করতে এই সংবাদ সম্মেলন।”
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মানিক চন্দ্র বর্মণ বলেন, আদালতে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের ত্রি-বার্ষিক নির্বাচনের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারির খবর জানাজানি হলে একটি পক্ষ তার ওপর রুষ্ট হয়। কোর্ট চলাকালীন তাকে জোরপূর্বক পিপির কক্ষে যেতে বাধ্য করা হয়। সেখানে পিপিসহ অপরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। মামলা পরিচালনার দায়িত্ব থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার আবেদনে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং হুমকি দিয়ে তাকে আদালত চত্বর থেকে বাড়িতে চলে যেতে বাধ্য করা হয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ২ নম্বর বিবাদী ও নির্বাচন কমিশনার অ্যাডভোকেট সামছুল হক সরকার বলেন, “নির্বাচন স্থগিতাদেশের কোনো নোটিশ আমার কাছে আসেনি এবং বাদীর আইনজীবীর নিকট থেকে পিপির কক্ষে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার বিষয় কিছুই জানি না। আর আগামীকাল নির্বাচন হবে কি না, তাও জানি না।”
১ নম্বর বিবাদী ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার ডা. মো. মাহফুজার রহমান বলেন, “কুড়িগ্রাম বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের ত্রি-বার্ষিক নির্বাচনের স্থগিতাদেশ হয়েছে কি না তা জানি না। এ সংক্রান্ত কোনো নোটিশ পাইনি। কাল যথারীতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট বজলুর রশিদের বক্তব্য জানতে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোনটি তার সহকারীকে দেন। সহকারী জানান, স্যার নামাজে গেছেন। পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফখরুল ইসলাম বলেন, “সংশ্লিষ্ট অ্যাডভোকেট মানিক চন্দ্র বর্মণের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিষয়টি জেনেছি। মোটর শ্রমিক নির্বাচন স্থগিতের জন্য ফাইলিং অ্যাডভোকেটকে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ পিপি বজলুর রশিদের সরকারি অফিস কক্ষে তুলে নিয়ে গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। পরে তার কাছ থেকে ওকালতনামা এবং দরখাস্ত ফরমে বলপূর্বক স্বাক্ষর আদায় করার পর বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কথা বলার পর মোবাইল বন্ধ করে রেখেছেন। অন্যদিকে পিপির এমন কাণ্ড নিয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ করেছেন মামলার বাদী। আদালত কর্তৃক জারিকৃত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার নোটিশ না পেলেও মৌখিকভাবে জানলেই আদালতের নির্দেশনা মানতে সবাই বাধ্য।”
উল্লেখ্য, কুড়িগ্রাম জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের ত্রি-বার্ষিক নির্বাচন শুক্রবার (১৪ আগস্ট) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে আদালতের স্থগিতাদেশের পরও নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি অব্যাহত রাখার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নির্বাচন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।