কুড়িগ্রামে এক সময় ফেলে দেওয়া মাছের উচ্ছিষ্ট আঁশ এখন রপ্তানি পণ্য হিসেবে বিদেশে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ কমছে, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ায় অনেকের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ফিরছে।
সাধারণত মাছের আঁশ বর্জ্য হিসেবেই ফেলে দেওয়া হতো। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে কুড়িগ্রামে এই আঁশই হয়ে উঠেছে মূল্যবান পণ্য। প্রতিবছর কয়েকশ মণ মাছের আঁশ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আয় করছেন লাখ লাখ টাকা। আঁশ সংগ্রহ, ধোয়া, শুকানো ও বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছেন স্থানীয় বহু মানুষ।
রুই, কাতলা, মৃগেল, কার্প ও ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির বড় মাছের আঁশের চাহিদা বেশি। শুধু আঁশই নয়, মাছের ফুলকা, কানকো, নাড়িভুঁড়ি ও অন্যান্য উচ্ছিষ্ট অংশেরও বাজার রয়েছে। বড় মাছের আঁশ সংগ্রহের পর তা পরিষ্কার পানিতে বা গরম পানিতে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে ঝরঝরে করা হয়। এরপর বছরে দুই থেকে তিনবার পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয়। প্রতি মণ আঁশের দাম দুই থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। শুকনো আঁশ কেজি প্রতি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয় ঢাকা, রংপুর ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার পাইকারদের কাছে।
মাছের আঁশে প্রচুর পরিমাণে কোলাজেন থাকে, যা খাদ্য, ওষুধ, ফুড সাপ্লিমেন্ট, প্রসাধনী সামগ্রী ও ক্যাপসুলের খোসা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ব্যাটারি, কৃত্রিম কর্নিয়া, বায়োপাইজোইলেকট্রিক ন্যানোজেনারেটর, রিচার্জেবল ব্যাটারি এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক পণ্য তৈরিতেও এর ব্যবহার রয়েছে। পোলট্রি খাদ্য হিসেবেও কিছু অংশ ব্যবহৃত হয়। জাপান, চীনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির ফলে এ খাতটি ক্রমেই লাভজনক হয়ে উঠছে।
রাজারহাট উপজেলার ব্যবসায়ী সুনীল চন্দ্র ও দিলীপ কুমার জানান, দীর্ঘদিন মাছের ব্যবসা করলেও গত বছর থেকে আঁশের ব্যবসা শুরু করেছেন। আগে এই আঁশ ফেলে দেওয়া হতো। কিন্তু আরডিআরএস বাংলাদেশের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর এখন তারা নিয়মিত আঁশ সংগ্রহ করে শুকিয়ে বছরে দুই থেকে তিনবার বিক্রি করছেন। এতে অতিরিক্ত আয় হচ্ছে।
খলিলগঞ্জ বাজারের পূর্ণ চন্দ্র দাস বলেন, বর্তমানে তিনি বড় মাছের আঁশ সংগ্রহ করেন। মাসে প্রায় ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত আঁশ পাওয়া যায়। সেগুলো পরিষ্কার ও শুকিয়ে বছরে তিনবার বিভিন্ন জেলার পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। পাশাপাশি মাছের নাড়িভুঁড়ি, পাকনা, পেটের বেলুন ও মাথার হরমোনযুক্ত অংশও বিক্রি করেন।
মাছ কাটার শ্রমিক সজিব জানান, আগে বাজারে মাছ কাটার সময় আঁশ ফেলে দেওয়া হতো। এখন সেগুলো সংগ্রহ করে মহাজনের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে, ফলে শ্রমিকরাও বাড়তি আয় করছেন।
আরডিআরএস বাংলাদেশের কৃষি বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার মশিউর রহমান বলেন, সংস্থাটির সহায়তায় প্রায় দুই বছর ধরে জেলার দুটি উপজেলায় ছয়জন মৎস্যজীবীকে পল্লী-কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সংগৃহীত আঁশ সদস্যদের মাধ্যমে পাইকারদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে, সেখান থেকে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। ভবিষ্যতে জেলার অন্য এলাকাতেও এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, মাছের আঁশ রাসায়নিক শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়। ফলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব শিল্প খাত হিসেবে এটি সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে। ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকে মাঝারি শিল্পে পরিণত করার লক্ষ্যে মৎস্য বিভাগ গুণগত মান রক্ষায় কাজ করছে।