কুড়িগ্রাম-২ আসন: রাজনৈতিক পালাবদলের প্রতীক্ষা

দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টির (জাপা) একচ্ছত্র দখলে থাকা কুড়িগ্রাম-২ আসনে এবার দৃঢ় প্রত্যয়ে মাঠে নামছে বিএনপি। ২০০১ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত একাধিকবার জাতীয় পার্টি প্রার্থী জয়ী হলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. হামিদুল হকের বিজয়ে আসনটির রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এবার আসনটি পুনরুদ্ধারে জাতীয় পার্টির দুর্বলতাকে পুঁজি করে জাপার এই ‘অপ্রতিরোধ্য দুর্গ’ ভাঙতে চায় বিএনপি। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে প্রার্থী করে কুড়িগ্রাম-২ আসনে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করছে বিএনপি।

তবে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, ইসলামি দলগুলোর ঐক্য গড়ে উঠলে বিএনপির কৌশল ভেস্তে যেতে পারে। এদিকে এনসিপির মতো উদীয়মান দলগুলোর যুক্ত হওয়ায় ইসলামি জোটের সম্ভাব্য শক্তি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন বিএনপির নেতারা।

কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী ও রাজারহাট উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে রয়েছে ২১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা। মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৬৭ হাজার ২০২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮০ হাজার ৭৩৬, নারী ভোটার ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬৩ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন তিনজন। নদীভাঙন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট এখানে দীর্ঘদিনের সমস্যা। ভোটারদের বড় একটি অংশ চরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যারা স্থানীয় ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছেন জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু, যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান হাসিব এবং সদস্য সচিব সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ।

তবে শেষ সিদ্ধান্ত দেবেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নেতাকর্মীরা এককভাবে যেকোনো প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবে বলেও জানিয়েছেন নেতৃবৃন্দ।

অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “বিএনপি বিগত কয়েকটি নির্বাচন বর্জন করায় জাপা ও আওয়ামী লীগ সুবিধা নিয়েছে। এবার সে সুযোগ আর থাকবে না। চরের উন্নয়ন, চর মন্ত্রণালয় গঠন এবং মাদকবিরোধী কমিটি গঠনের মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা মানুষের পাশে আছি। এবারের নির্বাচনে জনগণের রায় হবে পরিবর্তনের পক্ষে।”

বিএনপির উত্থান ঠেকাতে একযোগে মাঠে কাজ করছে ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো। ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামি থেকে অ্যাডভোকেট ইয়াছিন আলী সরকার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অধ্যক্ষ মাওলানা নূর বখত এবং এনসিপি থেকে ড. আতিক মুজাহিদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

অধ্যক্ষ মাওলানা নূর বখত বলেন, “তফসিল ঘোষণার পর ইসলামি দলগুলো এক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হবে। শেষ পর্যন্ত হাতপাখাই বিজয়ী প্রতীক হবে। এনসিপির সঙ্গে আমাদের ইতিবাচক আলোচনা চলছে।”

জামায়াত প্রার্থী ইয়াছিন আলী সরকার বলেন, “কুড়িগ্রাম দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা। আমি নির্বাচিত হলে কুড়িগ্রামে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা, আইসিইউ চালু, ধরলা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন, বন্ধ টেক্সটাইল মিল পুনরায় চালু করাসহ অর্থনীতি ও শিক্ষা খাতের ব্যাপক উন্নয়ন করবো।”

ইসলামি ঐক্য না হলে নির্বাচনে তিনটি দলের (বিএনপি, জামায়াত ও চরমোনাই) হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে অভিমত দেন ইসলামি আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা নূর বখত।

এনসিপি মনোনীত তরুণ প্রার্থী ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, “কুড়িগ্রামে ভিশন নেই। আমি কুড়িগ্রামকে ৬৩ নম্বর নয়, ৩ নম্বর জেলা হিসেবে দেখতে চাই। ত্রাণ নয়, চাই কর্মসংস্থান। চরাঞ্চলের নারীদের জন্য ‘কুড়ি শিল্প’ গড়ে তোলা, মাল্টি স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, আইটি হাব ও স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে আমরা কাজ করছি।”

তিনি বলেন, “১১৬ জন ডাক্তারের স্থানে ১৩ জন দিয়ে চিকিৎসা চললে গরিবরা বঞ্চিত হয়। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে হবে।”

২০০১ সালে জাতীয় পার্টির তাজুল ইসলাম চৌধুরী এক লাখ ২৩ হাজার ৮৮৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে এরশাদ দুই লাখ ৯ হাজার ৫০৫ ভোট পান। ২০০৯ সালে উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাফর আলী জয়ী হন। ২০১৪ সালে তাজুল ইসলাম চৌধুরী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন এবং ২০১৮ সালে পনির উদ্দিন আহমেদ জাতীয় পার্টির টিকিটে জয়ী হন।

তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে পনির উদ্দিনের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও জনবিচ্ছিন্নতার সুযোগে ট্রাক প্রতীকে ডা. হামিদুল হক এক লাখ ২ হাজার ১১৫ ভোট পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। ফলে আসনটিতে জাতীয় পার্টির অবস্থান অনেকটা নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম বলেন, “ভোট এলেই উৎসবের কথা শুনতাম, কিন্তু গতবার তেমন আমেজ ছিল না। এবার আমরা চাই একটা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক।”

ফুলবাড়ির ভোটার শাহ আলম বলেন, “ভোট দিতে পারি নাই বিগতবারগুলোতে। এবার যেন কেউ ভয়ভীতি না দেখায়, নিজের পছন্দে ভোট দিতে চাই। এটা আমার সাংবিধানিক অধিকার।”

কুড়িগ্রাম-২ আসন নিয়ে বিএনপি, ইসলামি জোটের মধ্যে জমজমাট লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রুহুল কবির রিজভীর মতো হেভিওয়েট নেতার নাম থাকলেও এককভাবে জয়ের নিশ্চয়তা নেই কোনো দলের। চরাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ, তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ, স্থানীয় ইস্যু এবং সম্ভাব্য ইসলামি ঐক্যই নির্ধারণ করবে কাদের হাতে থাকবে কুড়িগ্রাম-২ আসনের ভাগ্য।

Share With