জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যেমন- কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানো এবং বনভূমি ধ্বংসের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সূর্য থেকে আসা তাপ আটকে পড়ে এবং পৃথিবী ক্রমশ উষ্ণতর হচ্ছে।
কার্বন ডাইঅক্সাইড হল বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান গ্যাস, যার মাত্রা পূর্ব-শিল্প যুগ থেকে প্রায় ৫০% বেড়েছে এবং তা কয়েক মিলিয়ন বছরে দেখা যায়নি।পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে ৩৬ কোটি কিলোটন কার্বন-ডাই অক্সাইড বায়ুমন্ডলে নির্গত হয়। বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ একেবারে কম, বছরে মাত্র ৭৭ টন (প্রায় ০.১৭ ভাগ)। জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাপমাত্রা আর বর্ধিত তাপমাত্রায় স্বাস্থ্য, কৃষি এবং আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবসহ নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য ঝুকি:
সাম্প্রাতিক সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি জনিত কারণে হিট স্ট্রোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তীব্র গরম ও উচ্চ আদ্রতাযুক্ত আবহাওয়ার শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা ১০৪ ডিগ্রী ফারেনহাট বা তার ওপর চলে গেলে তাকে হিট্র স্ট্রোক বলে। এ ক্ষেত্র্রে বিবেচনায় রাখতে হবে যে বাতাসের তাপমাত্রা ৩০ ডি.সে হলেই যে প্রকৃত তাপমাত্রা তাই হবে এমনটি নয়। বাতাসের আদ্রতার পরিমাণের ওপর নির্ভর করে ফিললাইক বা অনুভূত তাপমাত্রা অনেক বেশি হবে। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় যে বাতাসের তাপমাত্রা যদি ৩৫ডি.সে হয় এবং আদ্রতা যদি ৭০ ভাগ হয় তাহলে রবার্ট জি স্টেডম্যান (১৯৭৯)এর সূত্রানুসারে ফিল লাইক তাপমাত্রা হবে ৫১ ডি.সে. যা আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মানদন্ড অনুযায়ী বা ইউএস ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস অনুযায়ী অত্যন্ত বিপজ্জনক বা মৃত্যুই নির্ধারিত পরিণতি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক ডাটা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪,৮৯,০০০ (প্রায় ৫ লাখ) মানুষ অতিরিক্ত গরম ও তাপপ্রবাহের (Heatwaves) কারণে মারা যান। এই মৃত্যুর প্রায় ৪৫% ঘটে এশিয়ায় এবং ৩৬% ঘটে ইউরোপে। মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট-এর ডাটা অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশে তীব্র গরমের কারণে শ্রমঘণ্টা নষ্টের পরিমাণ আগের চেয়ে প্রায় ৯২% বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মধ্যে ৬৪% ক্ষতিই হয় কৃষি খাতে। সাম্প্রতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র গরমে খোলা মাঠে বা বাইরে কাজ করা প্রায় ৮২% থেকে ৮৫% শ্রমিক হিট স্ট্রোকের শিকার হন।
হিট স্ট্রোকের সময় মানবদেহে যে পরিবর্তনগুলো ঘটে, তা মূলত একটি “অভ্যন্তরীণ অগ্নিকাণ্ড”-এর মতো। শরীরের কোষ এবং প্রোটিনগুলো বিকৃত হতে শুরু করে। এর ফলে শরীরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত তাপে মস্তিষ্কের কোষ (Neurons) ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে, যার ফলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা পানি জমতে পারে (Cerebral Edema)।
হৃদপেশিগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার কারণে হার্ট ফেইলিওর বা হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। অতিরিক্ত তাপে শরীরের মাংসপেশিগুলো গলে বা ভেঙে যেতে শুরু করে। এই ভেঙে যাওয়া পেশির প্রোটিন (Myoglobin) রক্তের মাধ্যমে কিডনিতে গিয়ে জমা হয় এবং কিডনির ছাঁকন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ জ্যাম বা বিকল করে দেয় যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় র্যাবডোমাইওলাইসিস বলে। হিট স্ট্রোকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লিভারের কোষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং লিভারের এনজাইমগুলো
অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে ‘অ্যাকিউট লিভার ফেইলিওর’ হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় ফুসফুসে পানি জমে যেতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ARDS (Acute Respiratory Distress Syndrome) বলা হয়। অনেক সময় রক্ত জমাট বাঁধার উপাদানগুলো শেষ হয়ে যাওয়ায় নাক, মুখ, মলদ্বার বা ত্বকের নিচ দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ (Internal Bleeding) শুরু হয়।
হিট স্ট্রোকে শুধু মানুষ নয় গবাদি পশু এবং অন্যান্য প্রাণী অবশ্যই আক্রান্ত হতে পারে। গবাদি পশু যেমন: গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির শরীরে ঘাম গ্রন্থি না থাকায় তারা ডানা মেলে দিয়ে এবং মুখ হাঁ করে শ্বাস ফেলে শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করে। তাপমাত্রা অতিরিক্ত বাড়লে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। কুকুর ও বিড়ালের শরীরে মানুষের মতো ঘাম গ্রন্থি নেই (কেবল পায়ের তালুতে সামান্য থাকে)। তাই এরা জিহ্বা বের করে দ্রুত শ্বাস নেওয়ার (Panting) মাধ্যমে শরীর ঠান্ডা করে। অতিরিক্ত গরমে এই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে এরা অবশ হয়ে পড়ে।
তীব্র তাপদাহে মানুষের মতো উদ্ভিদও ‘হিট স্ট্রোক’ বা তাপজনিত তীব্র সংকটে আক্রান্ত হয়। তবে উদ্ভিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে সাধারণত “হিট স্ট্রেস” (Heat Stress) বা “থার্মাল শক” (Thermal Shock) বলা হয়ে থাকে। মানুষ যেমন ঘামের মাধ্যমে শরীর ঠান্ডা রাখে, উদ্ভিদও তার পাতার ক্ষুদ্র ছিদ্র বা পত্ররন্ধ্রের (Stomata) সাহায্যে প্রস্বেদন (Transpiration) প্রক্রিয়ায় পানি বাতাসে ছেড়ে দিয়ে নিজের শরীর ঠান্ডা রাখে। কিন্তু তাপমাত্রা যখন উদ্ভিদের সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি ভেঙে পড়ে। অতিরিক্ত তাপে উদ্ভিদের কোষের ভেতরে থাকা প্রোটিনগুলো বিকৃত (Denature) হয়ে যায়। এর ফলে কোষের ভেতরের তরল শুকিয়ে যায় এবং কোষের দেয়াল বা প্লাজমা মেমব্রেন ফেটে যেতে পারে, যা মানুষের স্ট্রোকের মতোই আকস্মিক ও মারাত্মক।
কৃষিতে ঝুকি:
তীব্র তাপ প্রবাহ কৃষির জন্য একটি নীরব মহামারী। অত্যধিক গরমে উদ্ভিদের খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়া বা সালোকসংশ্লেষণ ঘটে ধীরে এবং খাদ্য ভাঙ্গনের শ্বসন প্রক্রিয়া দ্রুত ঘটে ফলে স্বল্প সময়ে গাছ তার জমানো শক্তি হারিয়ে ফেলে। দানাজাতীয় শস্যে যেমন: ধান, গম, ভুট্টা ইত্যাদি আগেই পেকে যায় ফলে দানা পুষ্ট হতে না পারায় আকার ছোট হয়ে যায় এবং ফলন কমে যায়। মাটির গভীরে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া এবং অণুজীবগুলো (Microorganisms) তীব্র তাপে মারা যায় বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, যা মাটির জৈব স্বাস্থ্যকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অতিরিক্ত তাপমাত্রা উদ্ভিদের কোষের ভেতরের প্রোটিন বা এনজাইমগুলোকে ভেঙে ফেলে ফলে গাছের স্বাভাবিক জীবনচক্র থমকে দাঁড়ায় এবং কৃষকের সামগ্রিক উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়ে। ধান সহ বেশির ভাগ ফসলী উদ্ভিদের পরাগায়নের সঠিক তাপমাত্রা ২২ থেকে ৩০ ডি.সে. এবং তা সকাল ৭.০০ টা থেকে বেলা ১১ টার মধ্যে সংঘটিত হতে হয়। উক্ত সময়ের পর ফুল বন্ধ হয়ে যায় তাই পরাগরেণু গর্ভমুন্ডে পতিত হতে পারে না। কোনোভাবে তাপমাত্রা যদি ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়ে যায়, তবে পরাগরেণু নষ্ট হয়ে চিটা দেখা দেয় এবং তাপমাত্রা যদি ২০° সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়, তবে পরাগধানী বা অ্যান্থার (Anther) ঠিকমতো ফাটতে পারে না। ফলে পরাগরেণু ছড়াতে না পেরে বন্ধ্যাত্ব দেখা দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপদাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ, ভারত ,পাকিস্তান এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ভবিষ্যতে তাপদাহজনিত ফসলহানির ঝুঁকিতে রয়েছে।
আবহাওয়াগত ঝুকি:
তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে বজ্রপাত বৃদ্ধির অত্যন্ত গভীর এবং সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। জলবায়ু বিজ্ঞানী এবং আবহাওয়াবিদদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে বজ্রপাতের সংখ্যা এবং তীব্রতা দুই-ই মারাত্মকভাবে বাড়ছে। বাতাসের তাপমাত্রা ১ডি.সে. বাড়লে আদ্রতা বাড়ে ৭% এবং বর্জ্রপাতের ঝুকি বাড়ে ১২%।
সাধারণত ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৩০° সেলসিয়াস থেকে ৩৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে এবং আদ্রতা ৬০ বা তার বেশি হলে কিউমুলেনিম্বাস মেঘের সৃষ্টি হয়।যা বজ্রপাত সৃষ্টির জন্য দায়ী। সহজভাবে বললে, আকাশে উঁচু, কালো, ফুলকপির মতো মাথাওয়ালা মেঘ দেখলে বুঝতে হবে সেটি কিউমুলোনিম্বাস মেঘ এবং সেখান থেকে নিশ্চিত বজ্রপাত হওয়ার আশংকা থাকে। এ ধরণের মেঘ সাধারণত: ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার উচ্চতা বিশিষ্ট হয়। মেঘের উপরের তাপমাত্রা মাইনাস ৪০°থেকে মাইনাস ৬০° সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায় এবং উপর অংশে তীব্র পজিটি চার্জ এবং নীচের অংশে নেগেটিভ চার্জ সৃষ্টি হয়। নেগেটিভ চার্জ আবার পৃথিবীর ভূপৃষ্টের নেগেটিভ চার্জকে বিকর্ষণ করে মাটির গভীরে ঠেলে দেয়। ফলে ভূপৃষ্টের উপরে শুধুমাত্র পজিটিভ চার্জ জমা হয় আর মেঘের নীচের নেগেটিভ চার্জের সাথে তীব্র আকর্ষণের ফলে বর্জ্রপাতের সৃষ্টি হয়। সমগ্র পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪৪টি বজ্রপাত ঘটে।
যানবাহন, কলকারখানা এবং ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়ায় প্রচুর পরিমাণে সালফেট, কার্বন ও সূক্ষ্ম ধূলিকণা (Particulate Matter) থাকে। এগুলোকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যারোসল’ বলা হয়।অ্যারোসল মেঘকে বৃষ্টির মাধ্যমে শান্ত হতে দেয় না, বরং তাকে আরও উঁচুতে পাঠিয়ে বরফ ও ঘর্ষণের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী “বৈদ্যুতিক জেনারেটরে” রূপান্তর করে। অ্যারোসেলের কারণে সৃষ্ট পজিটিভ লাইটনিং (Positive Lightning) বা ধনাত্মক বজ্রপাত সাধারণ বজ্রপাতের চেয়ে ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়।আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের (AGU) গবেষণা অনুযায়ী, সাধারণ নেগেটিভ বজ্রপাতে যেখানে ৩০ হাজার অ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎ থাকে, সেখানে পজিটিভ বজ্রপাতে ৩ লক্ষ অ্যাম্পিয়ার পর্যন্ত বিদ্যুৎ এবং প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ভোল্ট বিভব পার্থক্য তৈরি হয়।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার বজ্রপাতকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। বজ্রপাতে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় মানুষের জীবনের। ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার চেয়েও এখন বজ্রপাতে বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। ১৯৯০-এর দশকে এই সংখ্যা বছরে মাত্র ৩০ জনের কাছাকাছি ছিল, যা এখন তীব্র রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারান। গবেষণায় দেখা গেছে, বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তিদের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% হলেন প্রান্তিক কৃষক এবং জেলে। বজ্রপাতে শুধু মানুষ নয়, প্রতি বছর মাঠ বা হাওরাঞ্চলে চরে খাওয়ার সময় হাজার হাজার গরু, মহিষ ও ছাগল বজ্রপাতে মারা যায়। এটি খামারি ও কৃষকদের সরাসরি বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের কারণ।
লেখক: অধ্যক্ষ, (পি আর এল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ,কুড়িগ্রাম।