উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত ১৪৯০ মিটার দীর্ঘ হরিপুর-চিলমারী সেতু। বহুল কাঙ্ক্ষিত এই সেতুটি তিস্তা নদীর উপর নির্মিত তৃতীয় বৃহত্তম সেতু হিসেবে উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন পূরণের দ্বারপ্রান্তে। চলতি মাসেই (২৫ আগস্ট) এ সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। সেতুটি গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর থেকে শুরু হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মাধ্যমে দুটি জেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। ফলে রাজধানী ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামের দূরত্ব কমবে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার, যা সময় ও ব্যয়ের দিক থেকে যোগাযোগে বড় ধরণের বিপ্লব ঘটাবে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও একাধিকবার উদ্বোধন পেছানোর পর সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। এর ফলে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ায় ইতোমধ্যেই উদ্বোধনী প্রস্তুতি শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, সচিব মোঃ রেজাউল মাকছুদ জাহেদী, অর্থায়নকারী রাষ্ট্র সৌদি আরবের প্রতিনিধি, প্রকল্প পরিচালক আব্দুল মালেকসহ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সেতুটি উদ্বোধন করবেন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
২০২০ সালে এই প্রকল্পের কাজ শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED)। যৌথভাবে অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট। নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন। সেতুটি নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৯২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল সেতুতে ব্যয় হয়েছে ৩৬৭ কোটি টাকা এবং সংযোগ সড়ক, নদীশাসন, কালভার্ট ও ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছে ৩৬৩.৮৫ কোটি টাকা। অবকাঠামোগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সেতুটিতে রয়েছে ২৯০টি পাইল, ৩০টি পিলার, ২৮টি স্প্যান ও ১৫৫টি গার্ডার। পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ১২টি ব্রিজ ও ৫৮টি বক্স কালভার্ট। দুই পাশে নদীশাসন হয়েছে ৩.১৫ কিলোমিটার করে। সংযোগ সড়ক হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে সুন্দরগঞ্জে ৫০ কিলোমিটার এবং চিলমারীতে ৭.৩ কিলোমিটার সড়ক। জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে ১৩৩ একর।
সেতুটি চালু হলে শুধু দুটি উপজেলার মধ্যে সংযোগ স্থাপনই নয়, বরং উত্তরাঞ্চলের সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। এতে চিলমারী ও সুন্দরগঞ্জের মানুষের যাতায়াত সহজ হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি, পর্যটন, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে। সেতুর আশপাশে গড়ে উঠবে হোটেল-মোটেল, ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠান ও নানাবিধ ব্যবসায়িক উদ্যোগ, যা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজতর হবে এবং জরুরি চিকিৎসা সেবায় সময় বাঁচবে। নদীবন্দরকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক চেইন।
সেতু উদ্বোধনের সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই দুই পাশের মানুষের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, এই সেতু তাদের দীর্ঘ দিনের ভোগান্তি ও নদী পারাপারের দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে। যানবাহন সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও উন্নয়ন বঞ্চনার ইতিহাস পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাবে উত্তরাঞ্চল। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়, বরং এই অঞ্চলের মানুষদের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার প্রতীক, যা উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির পথ উন্মুক্ত করবে।
লেখক-জামিউল ইসলাম জামিল
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর।