সংস্কৃতি, ভাষা ও ইতিহাসের বৈচিত্র্যের কারণে এক সমাজে যা চরম সম্মান বা পবিত্রতার প্রতীক, অন্য সমাজে তা-ই হয়ে উঠতে পারে অদ্ভুত, অসম্মানজনক কিংবা আপত্তিকর। শব্দ ও অঙ্গভঙ্গির ক্ষেত্রে এই সাংস্কৃতিক ভিন্নতার কিছু উল্লেখযোগ্য ও চমকপ্রদ উদাহরণ নিচে আলোচনা করা হলো।
১. ভাষাগত ও শব্দার্থগত ভিন্নতা
‘গুরু’ (Guru) শব্দের দ্বিমুখী অর্থ:
আমাদের সংস্কৃতিতে ‘গুরু’ শব্দটি অত্যন্ত পবিত্র ও পূজনীয়। আধ্যাত্মিক শিক্ষক বা মেন্টরের সামনে বিনয় বজায় রাখা এবং তাঁদের উপদেশ মেনে চলাকে আমরা শিষ্টাচার মনে করি। অন্যদিকে, পশ্চিমা পপ-কালচারে শব্দটি অনেক সময় হালকা বা ব্যঙ্গাত্মক অর্থে ব্যবহৃত হয়; যেমন—কোনো মতবাদের অন্ধ অনুসারী সৃষ্টিকারীদের “Cult Guru” বলা হয়।
বাংলা সাহিত্যেও গুরুবাদের নেতিবাচক দিকের সমালোচনা পাওয়া যায়। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে লিখেছেন—”কাউকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা বা নিজের আত্মাকে অন্যের হাতে সঁপে দেওয়া গোলামির শামিল।” নজরুলের মতে, অন্ধ গুরুভক্তি মানুষের আত্মবিশ্বাস ও স্বকীয়তা বিনষ্ট করে।
‘ম্যাডাম’ (Madam) সম্বোধনের সাংস্কৃতিক ব্যাকরণ:
আমাদের দেশে কর্মক্ষেত্রে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান জানাতে ‘ম্যাডাম’ বলা হয়। পশ্চিমাদের কাছেও এটি শিষ্টাচারের প্রতীক। তবে উত্তর আমেরিকার কিছু অঞ্চলে অপরিচিত কাউকে ‘Madam’ (বা Ma’am) বললে তাঁরা নিজেদের অতিরিক্ত বয়স্ক ভেবে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন।
এছাড়া, ১৭ শতকের শেষভাগ থেকে ইংরেজিতে শব্দটির একটি গৌণ অর্থ হিসেবে “পতিতালয়ের পরিচালনা-কারী নারী” কে বোঝায়, যা এখনও বিখ্যাত অভিধানগুলোতে দেখা যায়।
‘কমরেড’ (Comrade) শব্দের মনস্তাত্ত্বিক রূপ:
সাম্যবাদী ও প্রগতিশীল রাজনীতিতে শ্রেণীবৈষম্য দূর করে সবাইকে সমান অধিকার ও আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ করতে ‘কমরেড’ বলা হয়। তবে ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অনেক সময় শব্দটি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা বা ভিন্নমত দমনের প্রতীক হিসেবেও নেতিবাচক ভাবমূর্তি বহন করে।
২. অনাত্মীয়কে পারিবারিক সম্পর্কে সম্বোধন
আমাদের সমাজে রিকশাচালক, দোকানি বা অপরিচিত পথচারীকে ‘ভাই’, ‘চাচা’ বা ‘মামা’ বলে ডাকা আন্তরিকতার প্রতীক।তবে কোরিয়ায় বয়স ও লিঙ্গভেদে ‘হ্যোং’ (Hyung), ‘ননা’ (Noona), ‘ওপ্পা’ (Oppa) বা ‘উননি’ (Unnie) ডাকার সুনির্দিষ্ট পারিবারিক নিয়ম রয়েছে। অন্যদিকে, জাপানে অপরিচিত কাউকে সরাসরি ‘ভাই’ (Nii-san) বা ‘বোন’ (Nee-san) বললে তারা বিভ্রান্ত ও অস্বস্তিবোধ করে; সেখানে সম্মান বজায় রাখতে নামের শেষে ‘সান’ (-san) যুক্ত করা বা সাধারণ সৌজন্যে ‘সুমিমাসেন’ (ক্ষমা করবেন) বলা হয়। পশ্চিমে বয়সে বড়দেরও নাম ধরে ডাকাই স্বাভাবিক নিয়ম।
৩. দৈহিক অঙ্গভঙ্গি ও সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি
বৃদ্ধাঙ্গুলি ও মধ্যমা প্রদর্শন:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে ‘থাম্বস আপ’ (Thumbs Up) এখন সম্মতি বা প্রশংসার প্রতীক। অথচ ইরান, ইরাক, তুরস্ক বা গ্রিসে এটি অত্যন্ত অশ্লীল গালি হিসেবে গণ্য হয়। আবার পশ্চিমা সংস্কৃতিতে মধ্যমা বা ‘Middle Finger’ প্রদর্শন চরম অশালীনতা ও আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি হিসেবে বিবেচিত, যা অনেক ক্ষেত্রে আইনি শাস্তিরও কারণ হতে পারে।
মাথা নাড়ানোর বিপরীত অর্থ:
বিশ্বের অধিকাংশ দেশে মাথা ওপর-নিচ করা মানে ‘হ্যাঁ’ এবং ডানে-বামে নাড়ানো মানে ‘না’। কিন্তু বুলগেরিয়া ও আলবেনিয়াতে এর ঠিক উল্টো! সেখানে ওপর-নিচে মাথা নাড়ালে ‘না’ এবং ডানে-বামে দোলালে ‘হ্যাঁ’ বোঝায়, যা ভ্রমণকারীদের জন্য চরম বিভ্রান্তি তৈরি করে।
৪. আতিথেয়তা ও আহারের বিচিত্র রীতি
পাত্রের খাবার সম্পূর্ণ খাওয়া (Cleaning the Plate):
আমাদের ও পশ্চিমা সংস্কৃতিতে প্লেটের সব খাবার শেষ করাকে রাঁধুনির প্রতি শ্রদ্ধা ও অন্ন অপচয় না করার পুণ্য কাজ মনে করা হয়। তবে চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সংস্কৃতিতে থালা চেঁছেপুঁছে খাওয়া মানে হলো—”মেজবান পর্যাপ্ত খাবার দেননি।” তাই মেজবানের উদারতা বোঝাতে সেখানে প্লেটে কিছুটা খাবার অবশিষ্ট রেখে দেওয়ার নিয়ম।
খাওয়ার সময় শব্দ করা (Slurping):
আমাদের সমাজে শব্দ করে চা বা স্যুপ খাওয়াকে অমার্জিত আচরণ মনে করা হলেও জাপান ও কোরিয়ায় নুডলস বা স্যুপ খাওয়ার সময় ‘সুড়ুৎ’ শব্দ করা বাধ্যতামূলক! এতে বোঝা যায় খাবারটি অত্যন্ত সুস্বাদু হয়েছে এবং তা বাবুর্চির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে।
৫. শব্দের অর্থগত বৈপরীত্য
বিভিন্ন ভাষার একই উচ্চারণের শব্দের অর্থগত ভিন্নতা কখনো কখনো হাস্যরস বা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে:
Gift: ইংরেজিতে যার অর্থ শুভ ‘উপহার’, জার্মান ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ভাষায় তার অর্থ ‘বিষ’ (Poison)!
Fart: ইংরেজিতে শরীরী বায়ু নিঃসরণের অশালীন শব্দ হলেও পোলিশ ভাষায় এর অর্থ ‘সৌভাগ্য’।
Crap: ইংরেজিতে ময়লা বা বর্জ্য বোঝালেও রোমানিয়ান ভাষায় এটি রুই জাতীয় একটি সুস্বাদু মাছ।
Mist: ইংরেজিতে স্নিগ্ধ কুয়াশা হলেও জার্মান ভাষায় এটি ‘গোবর’ বা বর্জ্য বোঝায়।
Cibo: ইতালীয় ভাষায় এটি সুস্বাদু ‘খাবার’, অথচ ফিলিপাইনের কথ্য ভাষায় এটি ধূর্ত বা পকেটমার অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে।
৬. উপহার দেওয়ার অদৃশ্য নিয়মকানু
সাদা ফুল:
আমাদের ও পশ্চিমা সংস্কৃতিতে সাদা ফুল (রজনীগন্ধা বা লিলি) শান্তি ও শ্রদ্ধার প্রতীক। কিন্তু চীন, জাপান ও কিছু ইউরোপীয় দেশে সাদা রঙ কেবল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার (Funeral) সাথে যুক্ত। তাই জীবিত কাউকে সাদা ফুল দেওয়া তাদের মৃত্যু কামনা করার শামিল!
ঘড়ি উপহার দেওয়া:
আমাদের সংস্কৃতিতে ঘড়ি অভিজাত উপহার হলেও চীনা সংস্কৃতিতে ঘড়ি উপহার দেওয়ার উচ্চারণ (sòng zhōng) হুবহু “শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া” বাক্যাংশের মতো শোনায়। তাই সেখানে ঘড়ি দেওয়াকে অমঙ্গলজনক ও মৃত্যুর কাউন্টডাউন মনে করা হয়।
৭. দৃষ্টিবিনিময় ও সামাজিক বিনয়
পশ্চিমা সংস্কৃতিতে কথা বলার সময় সরাসরি চোখে চোখ রাখা (Direct Eye Contact) সততা, আত্মবিশ্বাস ও সম্মানের প্রতীক। তবে বহু এশীয় ও আফ্রিকান সংস্কৃতিতে গুরুজন বা জ্যেষ্ঠদের চোখে চোখ রেখে কথা বলাকে বেয়াদবি ও ঔদ্ধত্য মনে করা হয়; সেখানে চোখ কিছুটা নিচু রাখাই হলো বিনয়ের লক্ষণ।
উপসংহার:
সংস্কৃতির এই বিচিত্র রূপ আমাদের শেখায় যে, পৃথিবীতে মানব আচরণের কোনো একক বা পরম (Absolute) নিয়ম নেই। স্থান, কাল ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের ফ্রেমে বন্দি হয়েই মানুষ তার সম্মান ও অসম্মানের ভাষা তৈরি করে। বিশ্বায়নের এই যুগে এই ভিন্নতাগুলোকে জানাই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের প্রথম ধাপ।
লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।