শীত সবার জন্য আশীর্বাদ নয়, কারও জন্য কেবল কষ্টের

শীতের রাত গভীর হলে শহরের আলো নিভু নিভু হয়ে আসে। অধিকাংশ মানুষ কম্বলের নিচে নিশ্চিন্তে রাত কাটালেও রাস্তায় বসবাস করা অসহায় মানুষের জীবন তখন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। রাজধানীর এক গলিতে সেই কঠিন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি রফিক। বয়স আনুমানিক পয়ত্রিশ-ছত্রিশ। মাথাভর্তি সাদা চুল, ক্লান্ত চোখ—যেন জীবনের ভারেই আরও বয়সী দেখায় তাকে।

দিনে ফুটপাথে ঠেলাগাড়ি চালিয়ে খেলা-ধুলার সামগ্রী বিক্রি করেন রফিক। কখনো ভ্যান ভাড়া করে মাল টানার কাজও করেন। কিন্তু শীত এলে কাজ কমে যায়, আয় হয় না বললেই চলে। রাতে গরম কাপড়ের অভাবে ঠান্ডা তার একমাত্র শত্রু।

গত রাত আড়াইটার দিকে রাস্তায় পড়ে থাকা কাঠ-কাগজ জড়ো করে ছোট্ট আগুন জ্বালিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখছিলেন রফিক। গায়ে জড়ানো একটি পুরনো ছেঁড়া চাদর, যা দিয়ে শীত প্রতিরোধের কোনো সুযোগই নেই। কনকনে হাওয়ায় তার হাত দুটো কাঁপছিল। আগুনটুকুই যেন তার একমাত্র আশ্রয়।

রফিক বলেন, “শীত লাগলেই কষ্টটা বেশি মনে হয়। সারাদিন খাটুনি করি, রাতে গরম কাপড় নাই… আগুন না ধরলে টিকাই যাইতাম না।” তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই, শুধু নির্মম বাস্তবতার কথা।

শহরের মানুষ শীতকে উৎসব মনে করলেও পথের মানুষের কাছে এ ঋতু আতঙ্কের নাম। রাতে কোথায় আশ্রয় মিলবে, কোথায় আগুন জ্বালানো যাবে—এগুলোই তাদের প্রতিনিয়ত ভাবায়। রফিক বলেন, “মানুষ ভাবে শুধু খাবারের অভাব। কিন্তু ঠান্ডার রাতে খাবারের চেয়েও বড় সমস্যা আগুন। আগুন না থাকলে ঘুমই আসে না।”

ভোরের আজানে যখন রাত ফুরোতে থাকে, তখনই ঠান্ডার দাপট সবচেয়ে বেশি। তাই আগুনে আরও একটু কাগজ ছুঁড়ে দেন রফিক। আগুনের ছোট্ট শিখা যেন তাকে বলে—আরও কিছুক্ষণ টিকে থাকো।

রফিকের মতো রাস্তার মানুষ হাজার হাজার। তারা শহরকে সেবা দেয়, শহরের ভিড়ে হাঁটে, কিন্তু তাদের রাতের সংগ্রাম অদৃশ্যই থেকে যায়। ছেঁড়া চাদর, ফাটা জুতা, আগুনের আলো আর ভোরের অপেক্ষা—এসবের মধ্যেই তারা শীত পার করার লড়াই চালিয়ে যায় প্রতিদিন।

শীত তাই সবার জন্য সমান নয়। কেউ শীত পায় আনন্দ আর উৎসবে, আর কেউ পায় টিকে থাকার কঠিন যুদ্ধ। রফিক নতুনদিনের অপেক্ষায় আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকেন—জানেন, আগুন নিভে গেলে ঠান্ডাই তাকে গ্রাস করবে। তবুও লড়াই থামে না; কারণ তার বেঁচে থাকার আর কোনো পথ নেই।

লেখিকা: আবিদা সুলতানা
শিক্ষার্থী,গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর

Share With