রঙিন কাগজে মোড়ানো সেই খামটি যখন হাতে এসে পড়ল, নাজিয়াহ ফাতিমা আসাদের আঙুলগুলো একটু নাড়াচাড়া করল। ভেতরে কী আছে, তা জানার জন্য তার মনটা কীভাবে দুরদুর করে উঠছিল! খাম খুলতেই চোখে পড়ল একটি শুভ্র কাগজ, যেখানে সোনালি অক্ষরে লেখা— “কুইন্স কমনওয়েলথ রচনা প্রতিযোগিতা, ২০২৫: গোল্ড অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী।” সেই মুহূর্তে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ঢাকার হলি ক্রস কলেজের সেই পরিচিত লাইব্রেরি, যেখানে কত বিকেল কেটেছে বইয়ের পাতায় পাতায়, আর স্বপ্নের জাল বুনেছে একটু একটু করে।
নাজিয়ার জন্য এই গোল্ড অ্যাওয়ার্ড শুধু একটি পুরস্কার নয়; এটি একটি যাত্রার সমাপ্তি এবং নতুন এক অভিযানের সূচনা। ২০২৫ সালের প্রতিযোগিতার প্রতিপাদ্য ছিল ‘আওয়ার কমনওয়েলথ জার্নি’। এই বিষয়টিকে সে দেখেছে এক মহাকাব্যের চোখ দিয়ে। তার কলমে ফুটে উঠেছে শুধু রাজনীতি বা ইতিহাস নয়, বরং সাধারণ মানুষের আবেগ, আশা-আকাঙ্ক্ষা আর সংগ্রামের গল্প। নাজিয়ার ভাষায়, “কমনওয়েলথ মানে শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি একটি জীবন্ত সত্তা, যেখানে ৫৬টি দেশের মানুষের হৃদস্পন্দন মিলেমিশে একাকার। আমি চেয়েছি আমার লেখায় সেই স্পন্দনকেই ধারণ করতে।”
এই যাত্রায় নাজিয়ার সঙ্গী ছিল তার পরিবার। বাবা-মায়ের অকুণ্ঠ, শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা আর বন্ধুদের উৎসাহ তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। হলি ক্রস কলেজের শিক্ষকরা মনে করেন, নাজিয়ার সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। তার মধ্যে রয়েছে অদম্য ইচ্ছা এবং জ্ঞানের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা। স্কুলের লাইব্রেরিয়ান স্মরণ করেন, নাজিয়াকে প্রায়ই ইতিহাস আর সংস্কৃতি বিষয়ক বই নিয়ে বসে থাকতে দেখা যেত।
নাজিয়ার এই সাফল্য শুধু তার একার নয়; এটি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীলতারই প্রতিচ্ছবি। যখন বিশ্বজুড়ে ৫৩ হাজার ৪৩৪টি রচনার মধ্যে থেকে তার রচনা গোল্ড অ্যাওয়ার্ডের মর্যাদা পেয়েছে, তখন এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের মেধাবী তরুণ-তরুণীরা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম।
এই প্রতিযোগিতার বিশেষত্ব হলো—এখানে রচনা হতে পারে গদ্য, পদ্য, নাটক বা চিঠি। নাজিয়ার লেখনী ছিল এমনই শক্তিশালী যে, তা জুরিদের হৃদয় স্পর্শ করতে পেরেছে। তার লেখায় ছিল বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের গল্প, ছিল অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের দিকে যাত্রার কাহিনী।
নাজিয়ার স্বপ্ন এখনো বড় হচ্ছে। সে বিশ্বাস করে, ভাষা আর লেখনীর শক্তি দিয়ে সে বিশ্বকে দেখাতে চায় বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে। তার এই অর্জন শুধু একটি পদক নয়; এটি একটি বার্তা—বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা হাজারো নাজিয়ার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
নাজিয়ার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি সাফল্যের পেছনে থাকে অদৃশ্য অনেক সংগ্রাম, অনেক রাত জেগে পড়াশোনা, আর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক অটুট বিশ্বাস। তার এই জয় আমাদের সকলের—সমগ্র জাতির। কারণ, যখন একজন নাজিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গৌরব বয়ে আনে, তখন সারা দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য উন্মোচিত হয় নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত।
নাজিয়ার কলমে লেখা যাত্রা এখনো শেষ হয়নি। এটি শুধু শুরু। আগামী দিনে তার রূপকথার পেন্সিল আরও অনেক রঙিন স্বপ্ন আঁকবে—বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে বিশ্বদরবারে।
লেখিকা
শিল্পী আক্তার
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ।