ঠাকুরগাঁও: ইতিহাস আর প্রকৃতির মিতালীতে ভরা এক জেলা

প্রাচীন ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয়েভরা বাংলাদেশের একটি ছোট্ট জেলা ঠাকুরগাঁও। পাশের জেলা পঞ্চগড় থেকে বাসে চেপে মাত্র দেড় ঘণ্টায় পৌঁছানো যায় এই জেলায়, যার আদি নাম ছিল ‘নিশ্চিন্তপুর’। ব্রিটিশ শাসনামলে এক ঠাকুর পরিবারের উদ্যোগে এখানে থানা স্থাপিত হয়, আর সেই সূত্রেই এই জনপদের নামকরণ হয় ঠাকুরগাঁও। শুধু ইতিহাসই নয়, এখানকার মানুষের আতিথেয়তা, শতবর্ষী স্থাপনা আর প্রাণচাঞ্চল্য এই জেলাকে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য করে তুলেছে অনন্য।

পুরাকীর্তির সন্ধানে
ঠাকুরগাঁওয়ের ইতিহাস খুঁজতেগেলে প্রথমেই চোখ পড়ে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের দিকে। জেলার রাণীশংকৈল উপজেলায় রয়েছে রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি। কুলিক নদীর তীরে অবস্থিত এই রাজবাড়িটি প্রায় ১০৩ বছরের পুরনো। একই উপজেলার নেকমরদে রয়েছে গোরক্ষনাথ মন্দির, কূপ ও শিলালিপি। বাংলাদেশে আবিষ্কৃত অন্যতম প্রাচীন শিলালিপি এখানে পাওয়া গেছে।

রাজা টংকনাথের জমিদার। ছবিঃ ফাইল ফটো

হরিপুর রাজবাড়ি প্রায় ১২৫ বছরের পুরনো এই বাড়িটি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মসজিদ, মন্দির, দীঘি আর গড়ের ধ্বংসাবশেষ। জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ (১৫১ বছরের পুরনো), ছোট বালিয়া জামে মসজিদ (জ্বিনের মসজিদ নামে পরিচিত), হরিণমারী শিব মন্দির (প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো) এবং রামরাই দীঘি (প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো) ভ্রমণের তালিকায় থাকা উচিত।

প্রকৃতির মাঝে অবকাশ
ঠাকুরগাঁওয়ের সবচেয়েবিখ্যাত প্রাকৃতিক আকর্ষণের মধ্যে একটি হলো বালিয়াডাঙ্গী সূর্য্যপুরী আমগাছ। হরিণমারী সীমান্তের কাছে অবস্থিত এই আমগাছটি প্রায় ১৫০ বছর পুরনো এবং এশিয়ার বৃহত্তম আমগাছ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এই গাছটি দেখতে আসেন।

বালিয়া মসজিদ। ছবিঃ সংগৃহীত

এছাড়াও জেলায় রয়েছে বেশ কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্র। পীরগঞ্জে প্রায় ১০ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ফান সিটি অ্যামিউজমেন্ট পার্ক। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় রয়েছে বলাকা উদ্যান যা কুমিল্লা হাড়ি বিনোদন কেন্দ্র নামেও পরিচিত। সদর উপজেলার আকচা গ্রামে অবস্থিত লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্য জাদুঘর এই অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতি ও জীবনযাপনকে জানার একটি অনন্য জায়গা।

এক সন্ধ্যার স্মৃতি
একজন ভ্রমণকারীতার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, এক সন্ধ্যায় তিনি ঠাকুরগাঁও শহর ঘুরে দেখতে বের হন একটি অটোতে। স্থানীয় চালক তাদের নিয়ে ঘুরিয়েছেন শহরের প্রশাসনিক ভবন ও বিভিন্ন ভাষ্কর্য। স্থানীয়দের সাথে কথোপকথন ও রাস্তাঘাট দেখার অভিজ্ঞতা তার কাছে খুবই আনন্দদায়ক ছিল। ভ্রমণ শেষে স্থানীয়দের প্রিয় খাবারের ঠিকানা মনতাজ হোটেল-এ খাবারের স্বাদও তার ভালো লেগেছে।

সংস্কৃতি ও উৎসবের জেলা
ঠাকুরগাঁওকে বলা হয় ‘বারো মাসে তেরো পার্বণের জেলা’। সারা বছরই এখানে কোনো না কোনো উৎসব লেগেই থাকে। দিনশেষে ক্লান্ত কৃষকের ঘরের দাওয়ায় বসে পুঁথি কিংবা পালা গানের আসর। এখানকার সংস্কৃতিতে জায়গা করে আছে সোনাভানের পুঁথি, দেওয়ান ভাবানার পালাপাঠ, ভাওয়াইয়্যা, ভাটিয়ালি, পল্লী গান, কোয়ালী গান, বিষহরি গান, সত্যপীরের গান, কবিগান, পালাগান এবং আদিবাসীদের গান।

ঢাকা বা দেশের অন্যান্য জেলা থেকে সরাসরি বাসে করে ঠাকুরগাঁও আসা যায়। জেলায় সাধারণ মানের হোটেল রয়েছে। আরডিআরএস গেস্ট হাউজে থাকতে চাইলে সংশ্লিষ্ট এনজিওর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার রেফারেন্স প্রয়োজন।স্থানীয় হোটেল ও রেস্টুরেন্টে সাধারণ বাংলাদেশী খাবার পাওয়া যায়।

মোছা: খাদিজা আক্তার
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর।

Share With