বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করা লাখো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন একটাই -পড়াশোনা শেষে নিজের পায়ে দাঁড়ানো, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু বাস্তবতা কতটা কঠিন, সেটা বোঝেন তারাই যারা এই পথ পাড়ি দিচ্ছেন। সেশনজট, যুগোপযোগী সিলেবাসের অভাব, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো আর সীমিত কর্মসংস্থান—এই চক্রে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের হতাশা ক্রমশ গভীর হচ্ছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের তিন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা গেল তাদের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির কথা।
সেশনজট ও সুযোগের অভাব: প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের লড়াই
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী -মো: নাঈমুর ইসলাম নাঈম জানালেন তার অভিজ্ঞতার কথা। তার ভাষায়:
“দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন ২২-২৩ বছরে গ্রাজুয়েশন শেষ করে, আমরা তখন সেশন জটের কারণে ২৫-২৬ বছর বয়সে শিক্ষাজীবন শেষ করি। টেকনোলজি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে বয়সটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। একটি চাকরি শুরু করতে বা বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে দুই-তিন বছর পিছিয়ে পড়া মানে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমরা শুরুতেই পিছিয়ে পড়ছি। এই সেশন জট আমাদের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।”
শুধু সেশনজট নয়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরলেন নাঈম:
“CSE এর মতো একটি বিভাগে অত্যাধুনিক ল্যাব সুবিধা, পর্যাপ্ত GPU ওয়ালা কম্পিউটার কিংবা ক্লাউড রিসোর্স থাকা উচিত যাতে শিক্ষার্থীরা Scalable প্রজেক্টে কাজ করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের হাতে গোনা কিছু প্রজেক্টে কাজ করার সুযোগ মেলে, যেখানে ইনোভেশনের চেয়ে মার্কস তোলাই মূল লক্ষ্য থাকে। শুধুমাত্র থিওরি পড়িয়ে ছেড়ে দিলে চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত হওয়া কঠিন।”
চাকরির বাজারের সাথে সিলেবাসের অসামঞ্জস্য নিয়েও সরব তিনি:
“চাকরির বাজারে এখন রিক্রুটাররা ‘Ready-to-Deploy’ গ্রাজুয়েট চায়। আমাদের সিলেবাসে AI/ML এর মতো কোর্স আছে ঠিক, কিন্তু বর্তমান টেক ইন্ডাস্ট্রিতে ডিমান্ডে থাকা ফ্রেমওয়ার্ক (যেমন – Django/React/Cloud Technologies) বা এন্টারপ্রাইজ লেভেলের সিস্টেম ডিজাইন শেখার সুযোগ কম। এই গ্যাপটা পূরণ করতে আমাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে রাত জাগতে হয়, যা আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সাথে রয়েছে শিক্ষক সংকট। ডিপার্টমেন্টে কোয়ালিটি ফুল শিক্ষক থাকলে আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থীরা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক ভালো অবদান রাখতে পারতো।”
উচ্চশিক্ষার মূল্য কোথায়?-
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী -অনুশ্রী রায়। তার কথায় ফুটে উঠলো এক গভীর হতাশা ও প্রশ্ন:
“পড়াশোনা করার একটা বড় উদ্দেশ্য হলো নিজের পায়ে দাড়ানো এবং পরিবারকে সাপোর্ট করা। এত বছরের পরিশ্রমের পরও যখন দেখি আমার যোগ্যতা অনুযায়ী জব হয়ত আমি কখনই পাবোনা তখন আসলে কিছু বলার ভাষাও থাকেনা। যদি বিকল্পই ভাবতে হয় তাহলে এই উচ্চশিক্ষার মূল্য কোথায়? বাবার পরিশ্রমের টাকা দিয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে শুরু থেকেই বিকল্প ভাবতাম।”
অনুশ্রীর এই প্রশ্ন আসলে দেশের লাখো শিক্ষার্থীর প্রশ্ন। যে উচ্চশিক্ষার পেছনে পরিবার সর্বস্ব বিনিয়োগ করে, সেই শিক্ষা যখন কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই শিক্ষার প্রকৃত মূল্য কী?
শিক্ষা ব্যবস্থা ও বেকারত্বের সম্পর্ক-
১৪ ব্যাচেরই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী -আশিক, সমস্যার মূলে গিয়ে বিশ্লেষণ করলেন:
“আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার বেশি হওয়ার পিছনের মূলে রয়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। কারন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো চাকরির বাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম তৈরি করতে পারছে না। কেননা, চাকরির জন্য যে পাঠ্যক্রম প্রয়োজন সেটা বিশ্ববিদ্যালয় তথা উচ্চশিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে নেই। যার ফলে বহু শিক্ষার্থী গতানুগতিক ডিগ্রি অর্জন করলেও বাজারের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও ব্যবহারিক, জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।”
মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের বিশেষ সংকটের কথাও উল্লেখ করলেন তিনি:
“বিশেষ করে আমরা যারা মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ থেকে পাস করি তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি, কারণ চাকরির বাজারে এসব ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম চাহিদা থাকে। তাছাড়াও আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টির অভাব বা বিনিয়োগ। যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনিয়োগ করা হয় এবং সে অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায় তাহলে বেকারত্ব অনেকাংশে কমে যাবে বলে আমি মনে করি।”
তিন শিক্ষার্থীর কথায় একটি সাধারণ সুর স্পষ্ট—বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে যে বিশাল ফাঁক, তা পূরণ না হলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। সেশনজট দূর করা, যুগোপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিনিয়োগ বাড়ানো—এই দাবিগুলো এখন আর শুধু দাবি নয়, জরুরি প্রয়োজন।
প্রশ্ন থেকে যায়—নীতিনির্ধারকরা কি শুনছেন এই তরুণদের কথা?
ফাহিম শাহরিয়ার
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর