নটি পাড়ার অন্ধকার ঘুচে জ্বলে উঠলো জাতীয় কবির দ্রোহের আলো: প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন

প্রতিটি জনপদের একটি আত্মা থাকে, যা প্রকাশ পায় তার নামের মধ্য দিয়ে। একটি মোড়, গলি বা এলাকার নাম কেবল ভৌগোলিক ঠিকানাই নয়; তা সেই জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সেখানে বসবাসকারী মানুষের আত্মসম্মানের প্রতীক। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজকাল আমাদের সমাজে একশ্রেণীর সুবিধাবাদী ও বিকৃত মানসিকতার মানুষ নিজেদের অপরাধ ঢাকতে এবং প্রান্তিক ও অসহায় মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কিছু এলাকার কুরুচিপূর্ণ নামকরণ করছে।

কোনো মানুষের যোগ্যতা, সততা ও নিষ্ঠা বিবেচনা না করে—কেবল তার জন্মস্থান বা স্থায়ী ঠিকানার ওপর ভিত্তি করে তাকে অপরাধী বা হেয় মনে করাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘স্থানিক কলঙ্কায়ন’ (Spatial Stigmatization) বলা হয়। যেমন: ঢাকার কড়াইল বস্তি, জহুরি মহল্লা কিংবা জেনেভা ক্যাম্পের মতো এলাকার ঠিকানা রিজিউমে (CV) দেখলে অনেক নিয়োগকর্তা ইন্টারভিউতে না ডেকেই আবেদন বাতিল করে দেন। তাঁরা ধরে নেন, ওই সব এলাকার বাসিন্দারা অশিক্ষিত, অপরাধপ্রবণ বা অসৎ।

স্থানিক কলঙ্ক সৃষ্টির পেছনের কারণ

সমাজের একশ্রেণীর প্রভাবশালী মানুষ নিজেদের আড়াল করতে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে দরিদ্র-অসহায় মানুষদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ায়। এই অন্যায়ের প্রসার ঘটাতে তারা সাধারণ মানুষের নামে সংশ্লিষ্ট এলাকা বা মোড়ের এমন কিছু কুৎসিত নাম তৈরি করে, যা ভদ্র মানুষের মুখে আনা কঠিন। এসব নামের সঙ্গে নানাবিধ মুখরোচক গল্প জড়িয়ে থাকায় তা দ্রুত সস্তা জনপ্রিয়তা পায় এবং ছড়িয়ে পড়ে। যেমন: চোখলখোরের মোড়, বাউদিয়ার মোড়, তাউরাসের বাজার, শয়তানপাড়া, দালালি পাড়া, সুদখোরের মোড়, চোরের গ্রাম, মারাদেওয়া, পাঠা ছাগলের মোড় ইত্যাদি। এছাড়া অপরাধমূলক পেশার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের নামেও এলাকার নামকরণ করে একধরনের নেতিবাচক ‘ব্র্যান্ডিং’ করা হয়।

স্থানিক কলঙ্কের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা

প্রথম ঘটনা: আমার এক ছাত্রী একটি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। তার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। মেয়ের যোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব ও পারিবারিক মর্যাদা—সব ঠিক থাকা সত্ত্বেও ছেলের বাবা বিয়েতে রাজি হচ্ছিলেন না। মেয়ের পরিবারের অনুরোধে আমি ছেলের বাবার সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, মেয়ের গ্রামের নাম ‘চোরের গ্রাম। সেখানে ছেলেকে বিয়ে করালে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হতে হবে। শেষ পর্যন্ত বিয়েটি আর হয়নি।

দ্বিতীয় ঘটনা: আমার আরেক ছাত্র বিশেষ একটি বাহিনীর ভাইভা পরীক্ষায় অংশ নেয়। তার স্থায়ী ঠিকানা ঠিক থাকলেও বর্তমান ঠিকানার জায়গায় লেখা ছিল ‘চোখলখোরের মোড়’। এ কারণে ভাইভা বোর্ডে তাকে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার চাকরিটি হয়নি।

তৃতীয় ঘটনা: আমার এক বন্ধু আমার বাসায় বেড়াতে এসে এলাকার নাম এবং তার প্রেক্ষাপট  শুনে বেশ বিব্রত বোধ করেন। আমি তাঁকে জানাই যে, আমরা একজন সম্মানিত সরকারি কর্মকর্তা ও সফল সমাজসেবকের নামে এলাকাটির নাম আমিনবাজার হিসেবে পরিবর্তনের চেষ্টা করছি। তবে স্থানীয় মানুষ তা সহজে গ্রহণ করছে না; হয়তো কিছু সময় লাগবে।

বন্ধুটির তিন ছেলের একজন ইউএনও, একজন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং অন্যজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।

তিনি আফসোস করে বললেন—তাঁর বাড়ির পাশে এক ব্যক্তি পাঁঠা ছাগলের খামার করার পর থেকে এলাকার নাম হয়ে গেছে ‘পাঠা ছাগলের মোড়’। এই বিদঘুটে নামের কারণে তিনি আজও তাঁর পুত্রবধূ কিংবা বিয়াই-বিয়াইনদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন না। এমনকি তিনি গ্রামবাসীকে খাইয়ে-দাইয়ে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দিলেও কাজ হয়নি। মূলত খামার মালিক নিজের ব্যবসা জমাতেই কৌশল করে এলাকাকে এই নামে পরিচিত করেছেন, যার সামনে একটি উচ্চশিক্ষিত পরিবারও আজ অসহায়!

ব্রোকেন উইন্ডোজ থিওরি 

১৯৮২ সালে মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী জেমস কিউ. উইলসন (James Q. Wilson) এবং জর্জ এল. কেলিং (George L. Kelling) ‘Broken Windows Theory’ উপস্থাপন করেন। এই তত্ত্ব মতে, কোনো জানালার ভাঙা কাচ যদি দীর্ঘদিন ধরে মেরামত করা না হয়, তবে অপরাধীরা মনে করে ভবনটি দেখার কেউ নেই। ফলে ধীরে ধীরে পুরো ভবনটিই ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। একইভাবে, সমাজে ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা বা নেতিবাচক নামকরণকে যদি শুরুতেই প্রতিরোধ না করে ফেলে রাখা হয়, তবে তা স্থায়ী রূপ নেয় এবং সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়।

মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে. মার্টনের (১৯৪৮) মতে, কোনো স্থান বা মানুষকে যদি ক্রমাগত অপরাধী বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেখানকার উদীয়মান প্রজন্মও অবচেতনভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে—”আমাদের এলাকাটাই এমন, তাই ভালো হয়ে কী লাভ?” আমাদের ভাবনা ও বিশ্বাস কেবল মাথার ভেতরই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা আমাদের আচরণ ও কর্মকে পরিচালিত করে বাস্তবে রূপ নেয়।

সরকারি উদ্যোগে নামের পরিবর্তন

মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার্থে  প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের ০৩ এপ্রিল ২৪৭ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করেছে। যেমন: রাজশাহীর তানোরের নটিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় করা হয়েছে। একইভাবে নাটোরের সিকিচোরা  সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম বিলাসী, নীলফামারীর দালালের বাজার হয়েছে চড়াইখোলা, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর পূর্ব সাপখাওয়ার নাম হয়েছে বর্ণমালা, পঞ্চগড়ের মাথাফাটার নাম হয়েছে মাধবীলতা, গাইবান্ধার ধূতিচোরা হয়েছে রহমান নগর, চূয়াডাঙ্গার দামুরহুদার পাটচোরা হয়েছে ছায়াবীথি, মুন্সীগজ্ঞের চোরমর্দন হয়েছে মুন্সীবাড়ি ইত্যাদি।  তবে রাঙামাটির ‘চুমাচুমি’, সিরাজগঞ্জের ‘নাকফাটা কিংবা কুড়িগ্রামের ‘দুধখাওয়া’ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো নামগুলো এখনো এলাকার মানুষের জন্য বিব্রতকর। এ নামগুলোও দ্রুত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক ও বেসরকারি উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা

সরকারের এই ইতিবাচক উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে একটি সুস্থ সমাজ গঠনের দায়িত্ব কেবল সরকারের একার নয়। আমাদের চারপাশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বাজার বা আবাসন প্রকল্পেও অহরহ এমন অদ্ভুত বা নেতিবাচক নাম চোখে পড়ে। লেখক ও সমাজসংগ্রামী সত্যেন সেন বলেছিলেন—“আমরা গড়বো এমন এক বিশ্ব, যেখানে প্রতিটি মানুষের পরিচয় হবে সম্মানের, অপমানের নয়।”

স্থানীয় পর্যায়েও কিছু সুন্দর পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত শুরু হয়েছে। যেমন: ‘রাঁধুনীর ঘাট’ থেকে ’আনন্দ বাজার’, ‘বেজির ভিটা’ থেকে ‘নীলারাম’ কিংবা শিয়ালখোড়া থেকে আউলিয়াপুর  ইত্যাদি অনেক ভালো উদাহরণও রয়েছে। আমরা যদি বিকৃত মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে রুচিশীল সংস্কৃতির চর্চা করতে পারি, তবেই একটি আলোকিত ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তাই অপমানের গ্লানি মুছে সম্মানের নতুন আখ্যান রচনায় বেসরকারি উদ্যোক্তা ও সাধারণ সমাজকে অবিলম্বে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।

Share With