ইতিহাসের সাক্ষী লাইব্রেরি এখন গোচারণভূমি

মোছা: আনিকা তাসনিন নদী, রংপুর প্রতিনিধি।

সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান মাহিগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। একসময় সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতি চর্চার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই পাঠাগারটি বর্তমানে পরিণত হয়েছে জরাজীর্ণ এক ভবনে—যার দেয়াল খসে পড়ছে, ছাদ ভেঙে গেছে, নেই দরজা-জানালা, মাঠ ব্যবহৃত হচ্ছে গোচারণভূমি হিসেবে।

প্রায় দেড় শতাব্দী আগে, ১৯১০ সালে তৎকালীন তাজহাটের জমিদার গোপাল লাল রায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মাহিগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি। ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত প্রায় দুই একর জমির উপর এই পাঠাগারটির সংগ্রহে ছিল দশ হাজারেরও বেশি দুর্লভ বই। এখানে নিয়মিত আয়োজন হতো সাহিত্য পাঠচক্র, নাট্যনির্দেশনা ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা।

এই পাঠাগারে একসময় পদচারণা করেছেন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী ও সংগীতশিল্পী আব্বাস উদ্দিনের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বরা। প্রতিষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল তৎকালীন রংপুর তথা উত্তরবঙ্গের বিদ্বজ্জন ও মনীষীদের মিলনস্থল।

কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর জমিদার পরিবারের প্রস্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রাজাকারদের হামলায় লাইব্রেরির বহু মূল্যবান সংগ্রহ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এরপর কিছুদিন আংশিক কার্যক্রম চালু থাকলেও ১৯৮২ সালের পর থেকে পাঠাগারটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে পড়ে।

বর্তমানে জরাজীর্ণ ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে এক নিঃসঙ্গ সাক্ষ্য হয়ে। সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ওঠা এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি আজ পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তুপে।

স্থানীয় সংস্কৃতি অনুরাগী ও সচেতন নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এটি কেবল মাহিগঞ্জ নয়, গোটা রংপুরের গর্ব। এমন একটি প্রতিষ্ঠান যদি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে আগামী প্রজন্ম তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত হবে।”

তাদের দাবি, অবিলম্বে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে মাহিগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরির পুনঃসংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হোক। এই পাঠাগারকে নতুন করে গড়ে তুলে রংপুরের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও ইতিহাস চর্চার হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

বর্তমান প্রজন্ম যখন ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে, ঠিক তখনই এমন একটি ঐতিহ্যবাহী পাঠাগারের অস্তিত্ব সংকটে পড়া শুধু দুঃখজনকই নয়, দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য এক ধরনের হুমকি। এখনই পদক্ষেপ না নিলে মাহিগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি হয়তো কেবল ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

Share With