কুড়িগ্রামে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘শিদল’

একসময় ভরা বর্ষায় কুড়িগ্রামের গ্রামাঞ্চলে সস্তায় পাওয়া যেত নানা প্রজাতির দেশীয় ছোট মাছ। হাতের নাগালে প্রচুর মাছ পাওয়ায় অনেক পরিবার বাড়িতেই তৈরি করত শুঁটকি। প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় দেখা যেত মাছ শুকানোর দৃশ্য। বাতাসে ভেসে বেড়াত শুঁটকির ঘ্রাণ। সেই শুঁটকি দিয়েই গ্রামের বধূরা তৈরি করতেন উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘শিদল’। তবে কালের বিবর্তনে দেশীয় ছোট মাছের সংকট ও পরিবর্তিত জীবনযাত্রার কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে এই খাবারটি।

শিদল তৈরির প্রধান উপকরণ দেশীয় ছোট মাছের শুঁটকি ও কচুর ডাঁটা। বিভিন্ন জাতের ছোট মাছের শুঁটকি ভালোভাবে শুকিয়ে গুঁড়ো করার পর কচুর ডাঁটা বেটে তার সঙ্গে মেশানো হয়। এরপর সরিষার তেল ও হলুদ হাতের তালুতে মেখে ওই মিশ্রণ থেকে বিভিন্ন আকৃতির শিদল তৈরি করা হয়।

তৈরি করা কাঁচা শিদল ১০ থেকে ১৫ দিন প্রখর রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া হয়। পরে ছাইয়ের সঙ্গে শিদল হাঁড়িতে সংরক্ষণ করা হয়। এভাবে সংরক্ষণ করলে দীর্ঘদিন পর্যন্ত শিদল নষ্ট হয় না। ফলে বর্ষা কিংবা অন্য কোনো সময় প্রয়োজন অনুযায়ী এটি রান্না করে খাওয়া যায়।

শিদল দিয়ে নানা ধরনের তরকারি রান্না করা গেলেও সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এর ভর্তা। উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে শিদল ভর্তা দীর্ঘদিনের পরিচিত ও প্রিয় খাবার। একসময় গ্রামের কৃষকেরা সকালে শিদল ভর্তা ও ভাত খেয়ে মাঠে কাজে যেতেন। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নেও খাবারের তালিকায় বিশেষ গুরুত্ব পেত শিদল ভর্তা।

স্থানীয়দের কাছে শিদল শুধু একটি খাবার নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ জীবন ও খাদ্যসংস্কৃতির একটি অংশ। বর্ষাকালে মাছ সহজলভ্য থাকায় ঘরে ঘরে শুঁটকি তৈরি এবং তা দিয়ে শিদল বানানোর প্রচলন ছিল। পরিবারের নারীরাই মূলত এই খাবার তৈরির কাজ করতেন।

তবে বর্তমানে দেশীয় ছোট জাতের মাছের অপ্রতুলতার কারণে আগের মতো শুঁটকি তৈরি হচ্ছে না। ফলে কমে গেছে শিদল তৈরির প্রচলনও। পাশাপাশি আধুনিক জীবনযাত্রায় গৃহস্থালির কাজের ধরন বদলে যাওয়ায় অনেক গৃহবধূ শিদল তৈরির দীর্ঘ ও পরিশ্রমসাধ্য প্রক্রিয়াকে ঝামেলার কাজ হিসেবে দেখছেন।

এ কারণে কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে একসময় বহুল প্রচলিত এই ঐতিহ্যবাহী খাবারটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, শিদল তৈরির ঐতিহ্য ধরে রাখা না গেলে শুধু একটি খাবার নয়, উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশও হারিয়ে যাবে।

Share With