কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ ও নির্বাচনী প্রচারণায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক দল ও সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবি, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে উৎসবমুখর পরিবেশে দ্রুত, গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হবে এবং পেশিশক্তির ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) কুড়িগ্রামে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন নিশ্চিতকরণে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ বিষয়গুলো উঠে আসে। বক্তারা সংসদীয় আসনে নারী আসন বৃদ্ধি, যুব প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাসহ অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিতের সুপারিশ করেন।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার অফিসার্স ক্লাব মিলনায়তনে সকাল ১১টা থেকে জেলা পর্যায়ের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় একশনএইডের নেতৃত্বে সুশীল প্রকল্পের অংশ হিসেবে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘উদয়াঙ্কুর সেবা সংস্থা (ইউএসএস)’ এ আয়োজন করে। সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রচারে ছিল দৈনিক প্রথম আলো।
বিএনপির ৩১ দফায় নারীর ক্ষমতায়ন ও মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে উল্লেখ করে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান বলেন, “আগামী নির্বাচনে আমাদের দল নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি দলীয় মনোনয়নে বিশেষ সুযোগ রাখবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনে চরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু ও যুব সমাজের প্রতিনিধিত্ব আরও বাড়াতে হবে।”
জামায়াতে ইসলামী কুড়িগ্রাম জেলার আমির মাওলানা আবদুল মতিন ফারুকী জানান, সরকার যে সময়েই নির্বাচন দিক, তাদের দল প্রস্তুত। তিনি বলেন, “আমাদের দেশে প্রচারণায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চরিত্র হননের প্রবণতা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন আইন করে এ ধরনের অপসংস্কৃতি বন্ধ না করলে সহিংসতা তৈরি হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের নির্বাচনে পেশিশক্তি ও কালোটাকার ব্যবহার বেড়েছে। এতে ভোটারদের মতামতের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। ব্যক্তিকেন্দ্রিক নির্বাচনে প্রার্থীরা প্রভাব খাটায়। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংখ্যানুপাতিক (পিআর) নির্বাচন পদ্ধতি জরুরি।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আতিক মুজাহিদ বলেন, “নির্বাচনের সময় নারী, পুরুষ, সংখ্যালঘু ও চরাঞ্চল নিয়ে নানা বক্তব্য দেওয়া হয়। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুশাসন। যখন রাষ্ট্রে গুড গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন নারী-পুরুষ, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক সবাই সমান সুযোগ পাবে। আমরা সবাই মিলে উন্নত বাংলাদেশ চাই।”
বাসদের জেলা সমন্বয়ক ফুলবর রহমান বলেন, “ধনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ ধনীদের ক্লাবে পরিণত হচ্ছে। গত নির্বাচনে যেখানে ২০ হাজার টাকায় মনোনয়ন দেওয়া হতো, এবার তা ৪০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এতে নির্বাচনী খরচ বেড়ে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কমছে।”
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কুড়িগ্রাম জেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি অধ্যক্ষ নুর বখত বলেন, “আজ যুবকেরা নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। প্রতিটি দলে অন্তত ২০ শতাংশ যুবককে সংরক্ষিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। পিআর পদ্ধতি কার্যকর হলে কোনো দল ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে পারবে না।”
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, “শুধু সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করে জাতীয় নির্বাচন সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন নাজুক। পুলিশ প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তাহলেই সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন সম্ভব হবে।”
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি শাকিলা শারমিন বন্যা বলেন, “সনাক কারচুপিমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা করে। ভোটকেন্দ্র দখল, সহিংসতা ও অন্যের ভোটাধিকার হরণ বন্ধ করতে হবে। ভোট গ্রহণকারীদের অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে। অন্যথায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের রক্ত ও ত্যাগ বিফলে যাবে।”
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা আহ্বায়ক খাইরুল আনাম বলেন, রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতি শুধু কাগজে–কলমে নয়, জনগণের কল্যাণে বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কুড়িগ্রাম জেলা সভাপতি রওশন আরা বেগম বলেন, “আমরা বরাবরই প্রতিটি দলে অন্তত ৩০ শতাংশ নারী নেতৃত্বের দাবি জানিয়ে আসছি। আগামী জাতীয় নির্বাচনে নারীদের জন্য অতিরিক্ত ১০০টি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বের দাবি জানাচ্ছি।”
জেলা যুব প্ল্যাটফর্মের সদস্য কলি রানী বলেন, যুব প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কাগজের পরিবর্তে ডিজিটাল প্রচারণা বাড়ানো, গাছে পেরেক ঠুকে পোস্টার লাগানো বন্ধ এবং উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে।
বৈঠকে রংপুরের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আরিফুল হক ও কুড়িগ্রামের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সফি খান বলেন, “কুড়িগ্রাম নদীমাতৃক জেলা, এখানকার অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রান্তিক মানুষের সমস্যা বিবেচনায় রেখে প্রতিশ্রুতি সাজাতে হবে।”
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে নাগরিক সমাজ সংস্থাগুলোর সুপারিশমালা পাঠ করেন ‘হাব’–এর সভাপতি সাইদা ইয়াসমিন। এর আগে প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন একশনএইডের কাজী মোরশেদ আলম।