বন্যার পানি থেকে আমনের চারা রক্ষায় উঠানেই বীজতলা, নতুন কৌশলে কুড়িগ্রামের কৃষক

কৃষিপ্রধান জেলা কুড়িগ্রামে বন্যা ও অকালবৃষ্টি নতুন কোনো দুর্যোগ নয়। প্রতিবছরই আকস্মিক প্লাবন ও অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষকের আমন বীজতলা। বিশেষ করে চরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকদের পড়তে হয় চরম বিপাকে। তবে এবার প্রকৃতির বৈরিতার কাছে হার মানেননি তাঁরা। বন্যার পানি থেকে আমনের চারা রক্ষায় বাড়ির উঁচু উঠানেই তৈরি করছেন ‘আপদকালীন বীজতলা’।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জুন ও জুলাইয়ে দুই দফা বন্যা এবং টানা ভারী বর্ষণে কুড়িগ্রামে প্রায় ৭৮ হেক্টর জমির বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে সময় লাগে। ফলে অনেক কৃষককে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে বাজার থেকে আমনের চারা কিনে জমিতে রোপণ করতে হয়।

এই সংকট মোকাবিলায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর চরাঞ্চলের কয়েকশ কৃষক। চরাঞ্চলের বসতভিটার জমি সাধারণত আশপাশের নিচু এলাকার তুলনায় উঁচু হওয়ায় সেই সুবিধাকেই কাজে লাগাচ্ছেন তাঁরা। বাড়ির ভেতর ও বাইরের উঁচু উঠানে তৈরি করছেন আমনের বীজতলা।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত তিন বছর ধরে এ পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরির সুফল পাচ্ছেন তাঁরা। ধীরে ধীরে পুরো চরাঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে পদ্ধতিটি। বসতভিটা উঁচু হওয়ায় বন্যার পানি সহজে বীজতলায় পৌঁছাতে পারে না। আবার বাড়ির কাছেই থাকায় নিয়মিত পরিচর্যা করাও সহজ হয়। বন্যার পানি নেমে গেলে এসব বীজতলার চারা তুলে দ্রুত মূল জমিতে রোপণ করা সম্ভব হচ্ছে।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, আগে বন্যা হলেই আমনের চারা সংগ্রহ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো। বাজার থেকে বেশি দামে চারা কিনতে গিয়ে বাড়তি খরচও হতো। এখন বাড়ির উঠানেই আপদকালীন বীজতলা তৈরি করায় সেই খরচ ও ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমিয়ে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে স্থানীয় কৃষকদের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে কৃষি বিভাগ। নারায়ণপুরের সফল অভিজ্ঞতা জেলার অন্যান্য বন্যাপ্রবণ চরাঞ্চলেও ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, বন্যার সময় কৃষকদের আমনের চারা সংকট মোকাবিলায় বাড়ির উঁচু উঠানে আপদকালীন বীজতলা একটি কার্যকর পদ্ধতি। এ উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং অন্যান্য দুর্যোগপ্রবণ এলাকাতেও এটি ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে কৃষকদের এই দেশীয় কৌশল শুধু তাঁদের সময় ও অর্থ সাশ্রয় করছে না, বরং বন্যার পর দ্রুত কৃষি উৎপাদন পুনরুদ্ধারের পথও তৈরি করছে। চরাঞ্চলের কৃষকদের এই উদ্যোগ তাই দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় জ্ঞান ও উদ্ভাবনী কৃষি কৌশলের একটি কার্যকর উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

Share With