জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামরিক খাতের বরাদ্দ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য ও দলটির ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান আতিকুর রহমান মোজাহিদ। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে প্রতিরক্ষা খাতের এই ‘তথৈবচ অবস্থা’ দূর করতে তিনি অর্থমন্ত্রীর প্রতি বাজেট পুনর্বিবেচনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
‘পাকিস্তান আমলে ঠিকঠাক বাজেট পেলে ভারতের সহায়তা ছাড়াই স্বাধীনতা আসত’
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে আতিক মোজাহিদ দেশের ইতিহাসের দিকে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় যদি আমাদের পর্যাপ্ত অস্ত্র থাকত, অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে যদি সামরিক খাতে ঠিকঠাক বাজেট পাওয়া যেত, তবে অন্য কোনো দেশের (যেমন ভারতের) সহায়তা ছাড়াই আমরা নিজেদের শক্তিতেই যুদ্ধ জিতে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারতাম।”
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত এক অদৃশ্য কারণে দেশের সামরিক খাতকে অবহেলা ও ছোট করে রাখা হয়েছে, যার পরিবর্তন আজও হয়নি।
‘৪২ হাজার কোটির বাজেটে সমরাস্ত্র কিনব কীভাবে?’
চলতি বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতের বরাদ্দের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, “এ বছর প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪২ হাজার কোটি টাকা। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, এর মধ্যে ৩৫ হাজার কোটি টাকাই চলে যাবে পরিচালনা ব্যয়ে। সামরিক খাতের আধুনিকায়ন বা উন্নয়নের জন্য বাকি থাকবে মাত্র ৭ হাজার কোটি টাকা।” অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “এত অল্প অর্থ দিয়ে কোন খাতের উন্নয়ন সম্ভব? আর কোন খাতেরই বা আধুনিক সমরাস্ত্র কেনা সম্ভব?”
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতি প্রসঙ্গ
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আতিক মোজাহিদ বলেন, এমন এক সময়ে সামরিক খাতকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে যখন দেশের চারপাশেই অস্থিরতা। তিনি বলেন:
পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি: দেশের ভেতরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে আমাদের বাহিনীর যুদ্ধ চলছে।
মিয়ানমার সীমান্ত সংকট: মিয়ানমারে চলমান যুদ্ধাবস্থার সাথে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে।
সীমান্তে হুমকি: প্রতিবেশী দেশ ভারত দিনরাত আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চল যেমন—রংপুর, ফেনী ও সাতক্ষীরা দখল করে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।
এই রকম একটি সংকটকালীন মুহূর্তে প্রতিরক্ষা খাতকে শক্তিশালী না করা আত্মঘাতী বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নৌ ও বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের অভাব
সমুদ্র ও আকাশসীমার নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এনসিপির এই এমপি জানান, বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমা পাহারার জন্য আমাদের আছে ১৯৮০ সালের পুরোনো মাত্র ২টি সাবমেরিন এবং হাতেগোনা কয়েকটি ফ্রিগেট। অথচ বর্তমান সময়ে দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে উন্নত সাবমেরিন ও অন্তত এক ডজনেরও বেশি আধুনিক ফ্রিগেট প্রয়োজন।
একইভাবে বিমানবাহিনীর জরাজীর্ণ দশা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের এখনও ১৯৬০ সালের বিমান ও পুরোনো এফ-সেভেন (F-7) এবং মিগ-২৯ (Mig-29) দিয়ে আকাশসীমা রক্ষা করতে হচ্ছে। বিশ্বের অতি নিম্নশ্রেণীর দেশগুলোতেও এর চেয়ে অনেক উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।”
জিডিপির তুলনায় প্রতিরক্ষা ব্যয় সর্বনিম্ন
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করে মোজাহিদ দেখান যে, বৈশ্বিক গড় সামরিক ব্যয় যেখানে জিডিপির ২.২ শতাংশ, সেখানে ভারত খরচ করে ২.৫ শতাংশ এবং মিয়ানমার ব্যয় করে ৩.৫ শতাংশ। কিন্তু সেই তুলনায় বাংলাদেশে এই হার অত্যন্ত হতাশাজনক ও নগণ্য।
বক্তব্যের শেষাংশে আতিক মোজাহিদ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদে প্রতিরক্ষার মতো সংবেদনশীল খাতে অবিলম্বে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য অর্থমন্ত্রীকে আহ্বান জানান। একই সাথে সামরিক খাতের জন্য প্রয়োজনীয় বাড়তি অর্থের যোগান নিশ্চিত করতে কোন কোন বিকল্প খাত থেকে অর্থ আনা সম্ভব, তার একটি রূপরেখাও তিনি সংসদের সামনে তুলে ধরেন।