রংপুরে বস্তি এলাকায় বাল্যবিবাহের ছোবল: অপরিণত মাতৃত্বে ধুঁকছে কিশোরীরা

সানজানা ইবনাত | রংপুর প্রতিনিধি

রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ২৭নং ওয়ার্ডের রেলস্টেশন সংলগ্ন বস্তি এলাকায় বাল্যবিবাহ এক নীরব মহামারিতে রূপ নিচ্ছে। দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে এখানকার বহু মেয়ে মাত্র ১২-১৫ বছর বয়সেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে। শিশু বয়সে গর্ভধারণের কারণে তারা পড়ছে গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে—বরণ করছে অপরিণত মাতৃত্ব ও শারীরিক জটিলতা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্লিপ্ততা এবং আইনের প্রয়োগে শিথিলতা এই সমস্যাকে আরও গভীরতর করেছে। সচেতনতামূলক কার্যক্রম চললেও তা খুবই সীমিত। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন সম্পর্কে অধিকাংশ পরিবারেরই নেই সঠিক ধারণা, যার ফলে আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ ঘটছে না।

এই এলাকার এক ভুক্তভোগী নারী এক করুণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, “আমার যখন বিয়ে হয়, তখন আমি পুতুল খেলতাম। সংসার বা মাতৃত্ব কী, বুঝতাম না। বিয়ের পরই গর্ভবতী হই। ডাক্তার বলেছিল, শরীর বাচ্চা ধারণের উপযোগী নয়। সেই থেকে শরীর ভেঙে পড়েছে।” জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতা, পুষ্টিহীনতা, জটিল প্রসব এবং ফিস্টুলার মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। অনেক সময় প্রাণহানিও ঘটে মায়ের কিংবা নবজাতকের।

বস্তি এলাকার অধিকাংশ পরিবারই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। অল্প খরচে মেয়ের বিয়ে দেওয়াকে অনেক পরিবার ‘সমাধান’ হিসেবে দেখছে। পাশাপাশি, বিদ্যালয়ছুটের হারও উদ্বেগজনক। দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাব এই সমস্যাকে দিন দিন বাড়িয়ে তুলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণে দরকার একটি সমন্বিত উদ্যোগ। দরিদ্র পরিবারে মেয়েদের জন্য বিশেষ সহায়তা ও বৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে, শিক্ষাজীবন নির্বিঘ্ন করতে স্কুলে যাতায়াতে নিরাপত্তা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালু করা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করাও অত্যন্ত জরুরি।

এই সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়—বরং দরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক আন্দোলন, যেখানে সরকার, বেসরকারি সংস্থা, স্থানীয় সমাজপতি ও গণমাধ্যম একসঙ্গে কাজ করবে কিশোরীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায়।

Share With