কুড়িগ্রামের প্রাকৃতিক সম্পদ: নদী, ভারী খনিজ ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত — প্রফেসর মীর্জা মো. নাসির উদ্দিন

দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রাম। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও এসব সম্পদের অনুসন্ধান, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় এখনো যুগোপযোগী ও সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। ফলে জেলার সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি এবং কুড়িগ্রামে উল্লেখযোগ্য শিল্পকারখানাও গড়ে ওঠেনি।

নদী ও চরাঞ্চল: সংকট থেকে সম্ভাবনায়

কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীর সংখ্যা ১৬টি। প্রধান নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার। জেলার সবচেয়ে বড় নদ ব্রহ্মপুত্র; যা তিব্বত ও ভারতের আসাম হয়ে কুড়িগ্রাম দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। উত্তরাঞ্চলের এই নদ-নদীগুলো এলাকার ভূপ্রকৃতি, কৃষি, জনজীবন ও অর্থনীতির ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে।

অসংখ্য নদ-নদী ও কুড়িগ্রামে ৪২০টিরও বেশি চর রয়েছে। তবে নদীশাসন ও কার্যকর নদী ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি, বসতভিটা ও অন্য ভূখণ্ড নদীগর্ভে বিলীন হয়। কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত জেলার ৯টি উপজেলায় ১৬টি নদ-নদীর ভাঙনে ২১,১৭৪টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে নদী কুড়িগ্রামের জন্য একদিকে যেমন দুর্যোগ ও ভাঙনের কারণ, অন্যদিকে তেমনি তা হতে পারে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম প্রধান উৎস।

নদীকে অভিশাপ নয়, সম্পদে পরিণত করার আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত

বিশ্বের নদীকেন্দ্রিক উন্নয়নের ইতিহাসে দেখা যায়, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি দুর্যোগপ্রবণ নদী অববাহিকাকেও অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব।

১৯৩০-এর দশকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি নদী অববাহিকা বন্যা, দারিদ্র্য ও অনুন্নয়নের কারণে একটি সমস্যাপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৩৩ সালে মার্কিন সরকার Tennessee Valley Authority (TVA) প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীকালে বাঁধ নির্মাণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নৌপরিবহন, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে টেনেসি উপত্যকার অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটানো হয়।

একইভাবে চীনের হোয়াংহো (Yellow River) নদী অববাহিকায় দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও কৃষি উন্নয়নের নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের Delta Works বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যা ও উপকূলীয় পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব উদাহরণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—নদীভাঙন, বন্যা ও জলসম্পদ-সংক্রান্ত ঝুঁকি অপরিবর্তনীয় কোনো অভিশাপ নয়; বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে নদীকেন্দ্রিক ঝুঁকিকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া সম্ভব।

নদী ও বালুচরে ভারী খনিজের সম্ভাবনা

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (BCSIR) তথ্যমতে, কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার চরাঞ্চলে জমা হওয়া পলি ও সূক্ষ্ম বালুর আনুমানিক পরিমাণ প্রায় ৬৩৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যা উন্নত মানের খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। হিমালয় থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্রের দীর্ঘ প্রবাহপথে বিভিন্ন ধরনের শিলা ও খনিজ পদার্থ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নদীর পলি ও বালুর সঙ্গে বাংলাদেশে এসে জমা হয়। এর ফলে নদীটির নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ভারী খনিজের ঘনত্ব তৈরি হয়েছে। এই খনিজগুলোকে সামগ্রিকভাবে Total Heavy Minerals (THM) বলা হয়। চিলমারীসহ ব্রহ্মপুত্র নদ অববাহিকার বালুতে বিদ্যমান এসব ভারী খনিজ নিয়ে জয়পুরহাটের Institute of Mining, Mineralogy and Metallurgy (IMMM)-সহ বিভিন্ন সরকারি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালিয়েছে।

A Preliminary Techno-Economic Evaluation of the Processing of Valuable Heavy Mineral Sands from the Brahmaputra River Basin শীর্ষক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চিলমারী থেকে নাগেশ্বরী এলাকার প্রায় ৩০,০০০ হেক্টর অববাহিকায় ১০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ বালুতে প্রায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩,৬৩০ কোটি টাকার মূল্যবান ভারী খনিজ রয়েছে। বৈজ্ঞানিক ও বাণিজ্যিকভাবে এসব খনিজ পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হলে তা দেশের শিল্পায়ন, আমদানি-নির্ভরতা হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কোন কোন মূল্যবান খনিজ রয়েছে?

এভারলাস্ট মিনারেলস লিমিটেডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের বিভিন্ন বালুচর থেকে সংগৃহীত প্রায় ১,৫০০ টন বালু জয়পুরহাটের Institute of Mining, Mineralogy and Metallurgy-তে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় বালুতে ইলমেনাইট, রুটাইল, জিরকন, ম্যাগনেটাইট, গারনেট ও কোয়ার্টজসহ বিভিন্ন খনিজের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতি টন বালুতে আনুমানিকভাবে—ইলমেনাইট ২ কেজি, রুটাইল ২০০ গ্রাম, জিরকন ৪০০ গ্রাম,,ম্যাগনেটাইট ৩.৮ কেজি,গারনেট  ১২ কেজি এবং কোয়ার্টজ ৫০ কেজি পাওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পরিমাণকে বাণিজ্যিক মাইনিংয়ের চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে গ্রহণ করার আগে আধুনিক পদ্ধতিতে আরও বিস্তৃত ভূতাত্ত্বিক জরিপ, নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রিজার্ভ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

শিল্পক্ষেত্রে এসব খনিজের ব্যবহার

বালু থেকে আহরণযোগ্য এই খনিজগুলোর প্রতিটিই বিশ্ববাজারে অত্যন্ত দামি এবং শিল্পক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত:

ইলমেনাইট ও রুটাইল: টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড পিগমেন্ট, ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোড এবং বিমান, রকেট ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত হালকা অথচ শক্তিশালী ‘টাইটানিয়াম অ্যালয়’ তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জিরকন: সিরামিক, টাইলস, রিফ্র্যাক্টরি (উচ্চ তাপসহনশীল উপাদান) এবং বিভিন্ন ধরনের ছাঁচ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

ম্যাগনেটাইট: লৌহ ও ইস্পাত শিল্পে ব্যবহারের পাশাপাশি ল্যাবরেটরি ও ভারী শিল্পে ব্যবহারযোগ্য।

গারনেট: এটি প্রধানত ওয়াটারজেট কাটিং, স্যান্ডব্লাস্টিং এবং শিল্পক্ষেত্রে ঘষামাজার কাজে (Abrasive) ব্যবহৃত হয়।

মোনাজাইট: এটি একটি অত্যন্ত মূল্যবান ও তেজস্ক্রিয় খনিজ, যাতে রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট (Rare Earth Element) এবং থোরিয়াম/ইউরেনিয়ামের সংমিশ্রণ থাকে (যা শক্তি ও আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পে ব্যবহৃত হয়)।

কোয়ার্টজ: কাঁচ শিল্প, মেটালার্জি এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

সম্ভাবনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

বাংলাদেশের Institute of Mining, Mineralogy and Metallurgy (IMMM), BCSIR, অস্ট্রেলিয়ার CSIRO Mineral Resources এবং RMIT University-এর গবেষকদের একটি প্রাথমিক techno-economic evaluation-এ কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী–চিলমারী অঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র নদীর ভারী খনিজ বালু আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় ১,৪০০ টন/ঘণ্টা ক্ষমতার একটি ধারণাগত mining ও processing plant-এর জন্য প্রায় ২৩ কোটি মার্কিন ডলার মূলধন বিনিয়োগ এবং বছরে প্রায় ২ কোটি মার্কিন ডলার পরিচালন ব্যয় অনুমান করা হয়। মডেল অনুযায়ী প্রকল্পটির সম্ভাব্য payback period প্রায় ৯ বছর এবং internal rate of return (IRR) প্রায় ১৫ শতাংশ। গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষ ও অদক্ষ—উভয় ধরনের জনবলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কর্মসংস্থানের সংখ্যা নির্ধারণের জন্য বিস্তারিত feasibility study প্রয়োজন।

বালু গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে আশার আলো

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) ব্রহ্মপুত্র নদসহ কুড়িগ্রামের বিভিন্ন নদ-নদীর বালুতে থাকা মূল্যবান খনিজ সম্পদ (যেমন— জিরকন, রুটাইল, ইলমেনাইট ও ম্যাগনেটাইট) নিয়ে গবেষণা ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য একটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় কুড়িগ্রাম জেলায় একটি আধুনিক বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র (Sand Processing and Research Centre) স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর অধীনে চিলমারীতে একটি পাইলট রিসার্চ প্ল্যান্ট এবং কুড়িগ্রাম জেলা সদরের টগরাইহাটে মূল গবেষণা কেন্দ্রটি করার কথা রয়েছে। প্রকল্পটির জন্য বর্তমানে Geological Survey of Bangladesh-এর মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন (Feasibility Study) প্রস্তুতের কাজ চলছে।

বর্তমানে সিরামিক, রং, গ্লাস ও স্টিল শিল্পের কাঁচামাল বাংলাদেশকে চড়া দামে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশীয় খনিজ সরবরাহ চালু হলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত খনিজ বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

আঞ্চলিক কর্মসংস্থান: চিলমারী অঞ্চলে প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট ও বাই-প্রোডাক্ট শিল্প গড়ে উঠলে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ খবরে কুড়িগ্রামের মানুষের মাঝে আশার আলো দেখা দিয়েছে।

লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।

Share With

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *