নদী, শ্রম আর অফুরন্ত সম্ভাবনার জনপদ কুড়িগ্রাম, তবুও কেন পিছিয়ে?

বাংলাদেশের মানচিত্রের উত্তর প্রান্তে তাকালে যে জেলাটি আপন মহিমায় ভাস্বর তার নাম কুড়িগ্রাম। অথচ আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের গল্প বলতে হয়। কুড়িগ্রাম সারা বাংলাদেশকে সাজিয়ে দেয় কিন্তু কুড়িগ্রাম নিজে যেন কিছুতেই সেজে উঠতে পারে না। অনেক নদ-নদী আর উর্বর পলল ভূমিতে ঘেরা এই জনপদ পরিশ্রমী মানুষের ঘামে ভেজা এক জনপদ। এখানকার নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া আর নির্মল প্রকৃতি এই অঞ্চলকে উত্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখায়।

কুড়িগ্রামের প্রধান সম্পদ হলো : এখানকার লড়াকু ও সৎ মানুষ এবং তাদের পদতলে লুকিয়ে থাকা এক অমূল্য প্রাকৃতিক ভাণ্ডার। বাংলাদেশের বড়বড় আবাসন প্রকল্প কিংবা পোশাক শিল্পের চাকা সচল রাখতে কুড়িগ্রামের মানুষের হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘামের গন্ধ মিশে আছে। এই সহজ সরল মানুষগুলোই ঢাকাসহ অন্যান্য বড়বড় শহরকে তিলোত্তমা বানাতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে, অথচ উন্নয়নের মানচিত্রে কুড়িগ্রাম আজও নিজের ঘর গোছানোর সুযোগ পায় না। 

সাম্প্রতিক গবেষণায় ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর বালুতে ইলমেনাইট এবং জিরকন সহ ম্যাগনেটাইটের মতো দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান খনিজ সম্পদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা এই অবহেলিত জনপদে এক নতুন অর্থনীতির ইঙ্গিত দেয়। এই দুষ্প্রাপ্য খনিজ আহরণ ও পরিশ্রমী জনবলকে কাজে লাগিয়ে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে কুড়িগ্রাম কেবল উত্তরবঙ্গের নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটাতে পারে।  

ইতিহাসের পাতায় কুড়িগ্রাম একসময় নদীমাতৃক বাংলাদেশের যোগাযোগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আসন গড়ে তুলেছিল। চিলমারী, যাত্রাপুর এবং নুনখাওয়ার মতো নদী বন্দরগুলো ছিল ব্যাবসায়িক ঐতিহ্যের প্রতীক। 

ভৌগোলিক দিক থেকেও কুড়িগ্রাম এক অনন্য জেলা যার সীমান্ত জুড়ে রয়েছে ভারতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য। এমন কৌশলগত অবস্থান বাংলাদেশের আর কোনো জেলার নেই। 

আমাদের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধেও কুড়িগ্রামের অবদান অবিস্মরণীয়। এটিই সেই জেলা যেখানে রৌমারীতে ১১ নম্বর সেক্টর এবং নাগেশ্বরীর ভুরুঙ্গামারী এলাকায় ৬ নম্বর সেক্টরের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। বিশেষ করে রৌমারী অঞ্চল ছিল বাংলাদেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল যেখানে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

কুড়িগ্রামের সবচেয়ে বড়ো ভূরাজনৈতিক সম্পদ হলো এর বিশাল চরাঞ্চল যা আজ অবহেলিত পড়ে আছে। অথচ আমরা যদি নেদারল্যান্ডের দিকে তাকাই তবে দেখতে পাই, একটি দেশ সমুদ্রের তলদেশ থেকে জেগে উঠেও সঠিক পরিকল্পনা আর শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে আজ বিশ্বের অন্যতম উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। নেদারল্যান্ড যদি সমুদ্র জয় করতে পারে, তবে আমরা কেন ব্রহ্মপুত্র আর ধরলার চরগুলোকে কাজে লাগিয়ে কুড়িগ্রামকে এক নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করতে পারব না? এই চরগুলো হতে পারে আধুনিক কৃষি ও ডেইরি ফার্মের অন্যতম উৎস।

কুড়িগ্রামের ভাগ্য বদলে দেওয়ার জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর একটি আধুনিক সেতু। এই সেতুটি নির্মিত হলে পুরো রংপুর বিভাগের সাথে ময়মনসিংহ এবং ঢাকাসহ চট্টগ্রাম ও সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থা বৈপ্লবিক রূপ লাভ করবে। এটি যমুনা সেতুর একটি অত্যন্ত কার্যকর বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করবে, যা সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই একটি সেতু কেবল কুড়িগ্রাম নয় বরং পুরো উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে।

অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আধুনিক যোগাযোগ এবং মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসার অভাবে কুড়িগ্রাম এখনো কিছুটা পিছিয়ে আছে। তবে, সঠিক পরিকল্পনা আর নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শিল্প ও শিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করা গেলে কুড়িগ্রাম হবে পুরো বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর ও সমৃদ্ধ এক জনপদ। কুড়িগ্রামের এই বীরত্বগাঁথা আর ত্যাগের ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার সময় এখনই। কুড়িগ্রাম যেদিন আপন সাজে সজ্জিত হবে সেদিনই পূর্ণতা পাবে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন।

প্রফেসর কাজী শফিকুর রহমান 

সাবেক অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ।

Share With