কুড়িগ্রামে নৌকা বাইচ দেখতে মানুষের ঢল, ঐতিহ্য ধরে রাখার দাবি

নদীর বুকে সারি সারি নৌকা, মাঝিদের ছন্দময় বৈঠার টান আর দুই পাড়ে মানুষের উপচে পড়া ভিড়—সব মিলিয়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। নদীর বুকে নৌকার ছুটে চলা দেখতে কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। আবার কেউ এসেছেন দূরদূরান্ত থেকে কয়েকটি অটোরিকশায় দল বেঁধে। 

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নুনখাওয়া ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে আয়োজিত নৌকা বাইচ দেখতে এমনই মানুষের ঢল নামে। নদীর দুই পাড়ে চোখে পড়ে শুধু মানুষ আর মানুষ।

প্রতিযোগিতাকে ঘিরে নদীতীরজুড়ে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। প্রবীণ থেকে শুরু করে শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। নৌকাগুলোর ছুটে চলা, মাঝিদের সম্মিলিত বৈঠার টান আর দর্শকদের করতালি ও উল্লাসে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়।

খেলা দেখতে আসা ৬৩ বছর বয়সী সোলেমান আলী বলেন, “আগে প্রায় প্রায় নৌকা খেলা হইছে কিন্তু এলা তো আর আগের মতোন হয়ে না। এলা এগলে খেলা উঠি যাবাইছে। খালি নৌকা খেলায় নোয়ায় আগত গরু খেলা, লাঠি খেলা এমন অনেক খেলায় হইছিলো।”

চর নারায়ণপুর থেকে আসা ৫৬ বছর বয়সী মাহাবুব আলম বলেন, “বাড়ীর সোগ কাজ কাম ফেলে থুইয়ে নৌকা খেলা দেখপের আসছি। কিন্তু এলা আর আগের মতো আমদ নাই।”

ভূরুঙ্গামারী থেকে আসা ৪৫ বছর বয়সী আয়নাল হক বলেন, “এই খেলায় আমাদের এলাকার কোনো নৌকা নেই। তবুও এতদূর থেকে খেলা দেখার জন্য আমরা চারটি অটোরিকশা নিয়ে এসেছি। এখানে এসে দেখি শুধু মানুষ আর মানুষ।”

নৌকা বাইচ দেখতে আসা ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মারুফ হোসেন বলে, “দাদির কাছে নৌকা বাইচের কথা শুনেছি। পরে মোবাইলে সার্চ দিয়ে এই খেলা দেখেছি, তখন ভালো লেগেছিল। তবে আজ সরাসরি খেলা দেখতে পেরে আরও বেশি ভালো লাগছে।”

পরিবার নিয়ে খেলা দেখতে আসা রবিউল আলম (৪৭) বলেন, “আমি আমার পরিবারের সবাইকে নিয়ে খেলা দেখতে এসেছি। আমার ছোট ছেলে তামিমের বয়স ৯ বছর। সে আগে কখনো নৌকা বাইচ দেখেনি। তাই তাকে নিয়ে পুরো পরিবার এসেছি। খেলা দেখে ভালো লেগেছে। তবে প্রচুর মানুষের ভিড় থাকায় ঠিকমতো খেলা দেখা যাচ্ছিল না। তারপরও সব মিলিয়ে ভালোই লেগেছে।”

স্থানীয়দের কাছে নৌকা বাইচ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীকেন্দ্রিক জনপদে নৌকা একসময় মানুষের যাতায়াত, জীবিকা ও যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল। সেই নৌকাকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের অন্যতম উৎস হিসেবে পরিচিত।

সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। বেড়েছে আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যম। তবু নৌকা বাইচ দেখতে মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে, ঐতিহ্যবাহী এই খেলার প্রতি মানুষের আগ্রহ এখনো রয়েছে। প্রবীণদের কাছে নৌকা বাইচ অতীতের স্মৃতি, আর নতুন প্রজন্মের কাছে এটি গ্রামবাংলার সংস্কৃতিকে সরাসরি জানার ও উপভোগ করার সুযোগ।

তবে প্রবীণ দর্শনার্থীদের কথায় উঠে এসেছে, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা খেলা আগের মতো আর দেখা যায় না। তাঁদের অভিজ্ঞতায়, একসময় নৌকা বাইচের পাশাপাশি গরুর দৌড় ও লাঠিখেলার মতো আয়োজনও ছিল। এসব ঐতিহ্য ধরে রাখতে নিয়মিত প্রতিযোগিতার পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।

নাগেশ্বরীর নুনখাওয়ায় নৌকা বাইচ দেখতে মানুষের এই সমাগম আবারও মনে করিয়ে দেয়, সময় বদলালেও গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে বৈঠার ছন্দে আজও মানুষের মনে আনন্দ জাগায় এই প্রাচীন খেলা।

Share With