তিস্তার তীব্র ভাঙনে আতঙ্কে স্থানীয়রা

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা থেকে চিলমারীর বজরা পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটারজুড়ে তিস্তা নদী প্রবাহিত হয়েছে। এর প্রায় ২০ কিলোমিটারই ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে।

উজানে ভারী বৃষ্টি কিংবা ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের পানি ছেড়ে দিলে ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজের গেট খুলে দেওয়া হয়। এতে কুড়িগ্রাম অংশে পানির চাপ বাড়ে। তলদেশে পলি-বালু জমে নাব্য কমে যাওয়ায় পানি বাড়লে তীব্র স্রোত তৈরি হয়, আর সেই স্রোতে ভাঙে নদীর পাড়।

জানা গেছে, ২০১৯ সালে কুড়িগ্রাম পাউবো তিস্তায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার খনন, বাঁধ সংস্কার ও সিসি ব্লক দিয়ে তীর প্রতিরক্ষার একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছিল। সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। পরে তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হলে প্রকল্পটি আর এগোয়নি।

এর আগে, গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজারহাটের বুড়িরহাট এলাকায় জিও ব্যাগ ধসে একটি ক্রস বাঁধের প্রায় ৪০ মিটার অংশ ভেঙে যায়। এতে প্রায় ২০ হাজার মানুষ নতুন করে ভাঙন ঝুঁকিতে পড়েছেন।

সম্প্রতি কথা হয় বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের রামহরি মৌজার ৬৮ বছরের বৃদ্ধ আকবর আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, বাবার পাঁচ বিঘা জমি ছিল। তিস্তার ভাঙনে সবই হারিয়েছি। এখন অন্যের জমিতে ঘর তুলে থাকি। এ বয়সে বাড়ি ভেঙেছে ১২ বার। নিজের জমি নাই। অন্যের জমিতে বাড়ি করে বাস করি। আশায় আছি, মহাপরিকল্পনা হলে যদি কিছু জমি ফেরত পাই।

একই এলাকার আয়েশা বেওয়া বলেন, তিস্তার ভাঙনে আটবার বাড়ি সরাতে হয়েছে। আমার জমিগুলো সব নদীতে গেছে। তিস্তা সব কেড়ে নিয়ে গেছে।

ঘড়িয়ালডাঙ্গার চর খিতাবখাঁ গ্রামের রেণু বেগমও নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়েছেন। ৬০ বছর বয়সী এই নারী একসময় তিনবারের ইউপি সদস্য ছিলেন। এখন তীররক্ষা বাঁধে আট সদস্যের পরিবার নিয়ে থাকেন। নিজের নলকূপ নেই, দূর থেকে খাবার পানি আনেন, আর গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করেন নদীর পানি।

রেণু বেগম বলেন, আগের তিস্তা আর নাই। এ তিস্তার বুকে চর আর পাড়ে ভাঙন আতঙ্ক।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, গত চার দশকে তিস্তায় বড় কোনো খনন প্রকল্প নেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় তলদেশে বালু-পলি জমে নাব্য কমেছে। বর্ষায় পানি বাড়লে স্রোতের চাপ বাড়ে, আবার পানি কমলে বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর জেগে ওঠে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে ভাঙন বাড়ছে।

বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম বলেন, ২০০০ সাল থেকে তার ইউনিয়নের সাতটি মৌজার প্রায় দেড় হাজার পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেরি হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী তীররক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, কুড়িগ্রামের তিস্তায় সাড়ে ১৪ কিলোমিটার এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা চলছে। আপাতত স্থায়ী তীররক্ষা বা নদী খননের কোনো পরিকল্পনা নেই।

তিনি বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে নদীর দুই পাড় সুরক্ষিত করে ভাঙনের স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে।

Share With

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *