প্রকৃতি ও লোকসম্পদে সমৃদ্ধ কুড়িগ্রামের ‘ইত্যাদি’

ইতিহাস-ঐতিহ্য-প্রাচীন নিদর্শন ও বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে গিয়ে ধারণের ধারাবাহিকতায় এবারের ‘ইত্যাদি’ ধারণ করা হয় উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামে। ধারণের স্থান ছিল উলিপুর উপজেলায় তৎকালীন জমিদার মহারাণী স্বর্ণময়ী নির্মিত দেড় শতাধিক বছরের প্রাচীন ‘উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুল এন্ড কলেজ’র সামনে। অনুষ্ঠানস্থলে দর্শক দেখে মনে হয়েছে ‘তিল ঠাঁই আর নাহি রে’। টিনের চালে, গাছের ডালে, স্কুলের বারান্দায়, ছাদে- সবই ছিল লোকে লোকারণ্য। ৩৭ বছরের পুরনো এই অনুষ্ঠান দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কতোটা জনপ্রিয় তা না দেখলে বোঝা যাবে না। ভাওয়াইয়া সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থান কুড়িগ্রামের পুরো অনুষ্ঠান জুড়েই যেন ছিল ভাওয়াইয়ার সুর। নদীমাতৃক এই অঞ্চলের এই গান সম্পূর্ণভাবেই নদী-নারী ও প্রকৃতি-নির্ভর। উলিপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ ভাওয়াইয়া একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ‘ভাওয়াইয়া ভাস্কর’ উপাধিপ্রাপ্ত শিল্পী ভূপতি ভূষণ বর্মার সাক্ষাৎকারে জানা গেল ভাওয়াইয়া গানের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছে, কারাই-বা এই গান গাইতো।

জানা গেল, ভূপতি ভূষণের জীবনী কুচবিহারের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ১৫ শতাধিক ভাওয়াইয়া শিল্পী তৈরি করেছেন। বেতারে তালিকাভুক্ত শিল্পীও রয়েছেন অর্ধশতাধিক। ভাওয়াইয়ার ভাব ও প্রচার-প্রসার এবং নতুন প্রজন্মকে ভাওয়াইয়া গানের তালিম দেয়ার লক্ষ্যেই ভূপতি ভূষণ এই একাডেমি করেছেন। সাক্ষাৎকারটি ছিল তথ্যসমৃদ্ধ। কুড়িগ্রামে রয়েছে প্রায় চার শতাধিক চর। এখানকার একমাত্র বাহন ঘোড়ার গাড়ি। এসব অঞ্চলে বেশির ভাগ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। তবে, শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত নিম্নমানের। দৃষ্টিনন্দন নির্মাণে চরের এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে- চরে অধিকসংখ্যক স্কুল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা, বাল্যবিয়ে রোধ করা, নদীতে গাওয়া মাঝির কণ্ঠে ভাওয়াইয়া গান আর বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে কাশবনের সৌন্দর্য। চরের সৌন্দর্য তুলে ধরে হানিফ সংকেত এখানে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনার কথাও বলেন। চরের এই অজানা ও অচেনা সৌন্দর্য ইত্যাদিতে দেখার পর অনেক পর্যটকই এই অবহেলিত জনপদে যাবেন চরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। প্রতিবেদনটি ছিল অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ। অনেকেই অবাক হয়েছেন আব্বাস উদ্দীনের গাওয়া সেই চিলমারী বন্দর দেখে। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে চমৎকার পরিবেশে বন্দরটি অবস্থিত।

বলা হয়েছে, এটি বাংলাদেশের ২৭তম নদীবন্দর। অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দর্শকরা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ভূরুঙ্গামারীর বাড়ি এবং তার পরিচিতি সম্পর্কে জানতে পারেন। অবিভক্ত বাংলার আসামে ভাসানীর অনেক ভক্ত থাকায় তিনি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য ভূরুঙ্গামারীর সীমান্ত সংলগ্ন কামাত আঙ্গারিয়া গ্রামে এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। মহারাণী স্বর্ণময়ীর অনেক কীর্তিকেও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০১১ সালে ইত্যাদিতে দেখানো কর্মোদ্যোগী যুবক আব্দুল কাদেরকে দীর্ঘ ১৪ বছর পর আবারো এই পর্বে দেখানো হলো। এখনো তার কল্যাণমুখী কাজ থেমে নেই বরং যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন কাজ। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের কল্যাণে তিনি অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ করছেন, দিচ্ছেন সৎ মানুষকে সততা পুরস্কার; যা প্রশংসনীয় ও শিক্ষণীয়। সবশেষে ছিল ২০২৪ সালে বিবিসি প্রকাশিত বিশ্বে সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী এবং প্রভাবশালী ১০০ জন নারীর তালিকায় স্থান পাওয়া কুড়িগ্রামের রিকতা আখতার বানুর ওপর মানবিক প্রতিবেদন। যিনি চিলমারী বন্দরের কাছে প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘রিকতা আখতার বানু (লুৎফা) বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়’। বর্তমানে তার স্কুলে ৩০০ জন প্রতিবন্ধী শিশু রয়েছে। তার এই সংগ্রামী যাত্রা অন্য নারীদেরও অনুপ্রাণিত করবে। অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য একটি প্রজেক্টর ও খেলার সামগ্রী কেনার জন্য দুই লাখ টাকার চেক প্রদান করা হয়। ইত্যাদিতে ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দীনের চিলমারী বন্দরকে নিয়ে গাওয়া ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’ গানটি গেয়েছেন সালমা আক্তার ও পূর্ণ চন্দ্র রায়। গানটি দর্শকরা অত্যন্ত উপভোগ করেছেন। এবারের দর্শক পর্বও সাজানো হয়েছে ভাওয়াইয়া গান নিয়ে। চারটি ভাওয়াইয়া গান গেয়েছেন নির্বাচিত চারজন দর্শক। এ ছাড়াও, অনুষ্ঠান জুড়ে ছিল বক্তব্যধর্মী, সমাজবান্ধব কিছু নাটিকা। যেমন- যত দোষ এআই ঘোষ, আন্দোলনে লোক সরবরাহ করা ঠিকাদারের সাক্ষাৎকার, জ্ঞানী ও মূর্খদের কথা, রিকশাচালকের দুঃখ, বিদেশ ভ্রমণে সেলফি রোগ, টকারের একান্ত সচিবের ব্যস্ততা, দাওয়াত খেতে এসে টাকা দেয়া, পাত্র দেখে পাত্রীর আর্তচিৎকার এবং যথারীতি কাশেম টিভি’র রিপোর্টারের সঙ্গে নাতির আলাপ। এবারের বিদেশি প্রতিবেদনে সিঙ্গাপুরের কুসুম দ্বীপ ভালো লেগেছে। আর পুরো অনুষ্ঠান জুড়েই ছিল যথারীতি বরেণ্য নির্মাতা হানিফ সংকেতের ভালোলাগা ছন্দময় কথার ফুলঝুরি। সবশেষে এবারের লোকসংগীত সমৃদ্ধ ‘ইত্যাদি’ উপহার দেয়ার জন্য হানিফ সংকেত ও ফাগুন অডিও ভিশনকে ধন্যবাদ।

Share With