বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৫% থেকে ৬% এলাকা চরাঞ্চল এবং এর আয়তন ৮,০০০ বর্গ কিলোমিটারের চেয়েও বেশি। বিভিন্ন সময়ের উপগ্রহ চিত্র এবং কৃষি জরিপ অনুযায়ী, ছোট-বড় এবং স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে চরের সংখ্যা প্রায় ৪,০০০টি। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪% মানুষ (আনুমানিক ৭০ থেকে ৭৫ লাখ) এই বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে জীবন সংগ্রাম করে বসবাস করছেন। বাংলাদেশের প্রায় ৩২টি জেলার ১২১টিরও বেশি উপজেলায় এই চরাঞ্চলগুলো ছড়িয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে চরাঞ্চলের জন্য আলাদা কোনো মন্ত্রণালয় নেই। অথচ দেশের মাত্র ১৩,২৯৫ বর্গকিলোমিটার বা ১১.১৯% আয়তনে বসবাসকারী মাত্র ১.০৩% লোকের জন্য রয়েছে আলাদা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং জলবায়ুগত ঝুঁকির কারণে বিশ্বের বহু দেশেই “দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চল”-এর জন্য বিশেষ মন্ত্রণালয় বা রাষ্ট্রীয় নীতি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কার্যকর রাখা হয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র কুক আইল্যান্ডসে “Ministry of Outer Islands Special Projects” নামে একটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় রয়েছে। গ্রিসের হাজার হাজার দ্বীপের জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক সমন্বয়ের জন্য নৌ ও দ্বীপ নীতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় রয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের একটি প্রধান কাজই হলো দ্বীপ অঞ্চলের বাসিন্দাদের অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। আয়ারল্যান্ড সরকারের Department of Rural and Community Development-এর অধীনে “Our Living Islands” নামক একটি জাতীয় দ্বীপ নীতি ও বিশেষায়িত শাখা রয়েছে। এর কাজ হলো মূল ভূখণ্ডের বাইরের বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোর জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ধরে রাখা।
ইংরেজ কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ তাঁর বিখ্যাত কবিতা “দ্য রাইম অব দ্য অ্যানশেন্ট মেরিনার”-এ বলেছেন— “Water, water, every where, Nor any drop to drink.”অর্থাৎ সর্বত্র পানি আর পানি, কিন্তু পান করার মতো এক ফোঁটাও নেই। কারণ, মানুষের কিডনি সর্বোচ্চ ২% লবণাক্ত তরল প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, কিন্তু সাগরের পানির লবণাক্ততা প্রায় ৩.৫%। একইভাবে, মরুভূমিতে বালি আর বালি, কিন্তু এ বালি দিয়ে কোনো নির্মাণকাজ করা সম্ভব নয়। মরুভূমির বালি মসৃণ ও গোলাকার হওয়ায় তা সিমেন্ট বা পানির সাথে মিশে শক্ত কোনো রাসায়নিক বন্ধন তৈরি করতে পারে না; ফলে কংক্রিট সহজেই ভেঙে বা ধসে পড়ে। উদাহরণ দুটি চরবাসীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য; কারণ একটি দেশের সরকারের পক্ষ থেকে জনসাধারণের মঙ্গলের জন্য যা কিছু করা হয়, তা চরবাসী সঠিকভাবে পায় না।
সরকারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আধুনিক কৃষি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা—সবকিছু থেকেই চরবাসী বঞ্চিত। নদীভাঙন, মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্নতা, পলি ও বালুময় মাটি, খাস জমি এবং লাঠিয়াল প্রথাসহ নানা কারণে চরবাসীর অবস্থা যেন ‘‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই। সব চরে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই, আর থাকলেও শিক্ষা চলে ভাড়াটিয়া বা অল্পসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে। স্বাস্থ্যসেবা নেই বললেই চলে; জরুরি প্রয়োজনে দুর্গম পথ বেয়ে উপজেলা বা জেলা সদরে রোগী নিয়ে আসার পথেই অনেকে মারা যান।
১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি’র ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালে একটি সম্পূর্ণ নিবেদিত “পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়” গঠিত হয়েছিল। এর ফলে পাহাড়ের দুর্গম ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। পাহাড়ের এই সফল মডেলের সঙ্গে মিল রেখে যদি একটি স্বতন্ত্র “চর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়” প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে চরের প্রান্তিক মানুষের জীবনেও অভূতপূর্ব কিছু সুনির্দিষ্ট সুবিধা নিশ্চিত হবে। নিচে সেই সম্ভাব্য সুবিধাগুলো তুলনা করে আলোচনা করা হলো:
১. চরের উপযোগী ‘বিশেষায়িত ও টেকসই অবকাঠামো’ নির্মাণ
পাহাড়ের ঢালু ও পাথুরে রাস্তার জন্য পার্বত্য মন্ত্রণালয় যেভাবে বিশেষায়িত সড়ক ও সেতু নির্মাণ করেছে, ঠিক তেমনি চর মন্ত্রণালয় চরের বালুময় মাটি এবং বন্যাপ্রবণ ভৌগোলিক বাস্তবতাকে মাথায় রেখে অবকাঠামো তৈরি করবে। সাধারণ পাকা রাস্তার পরিবর্তে চরে বন্যা-সহনশীল সাবমার্সিবল (ডুবন্ত) রাস্তা, শক্তিশালী আরসিসি ব্লক রোড এবং চরের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ রক্ষাকারী টেকসই ঘাট ও পল্টুন নির্মিত হবে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি স্থায়ী সমাধান আসবে।
২. নদীভাঙন ও জলবায়ু উদ্বাস্তুদের তাত্ক্ষণিক পুনর্বাসন
পার্বত্য অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও স্থানচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনে ওই মন্ত্রণালয় যেভাবে মূল ভূমিকা রাখে, চর মন্ত্রণালয়ও চরের সবচেয়ে বড় অভিশাপ নদীভাঙন মোকাবিলায় একক দায়িত্ব নিতে পারবে। প্রতি বছর নদীভাঙনে জমি ও ঘর হারানো মানুষদের জন্য একটি “জরুরি চরাঞ্চল পুনর্বাসন তহবিল” থাকবে। ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোকে দ্রুত খাস জমিতে স্থায়ী গুচ্ছগ্রাম বা বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে পুনর্বাসন করা সম্ভব হবে, যা এখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ধীরগতিতে চলে।
৩. চরের ভূ-প্রকৃতির উপযোগী ‘বিশেষ কৃষি ও অর্থনৈতিক মডেল’
পাহাড়ের জুম চাষ, ফলদ বাগান এবং হর্টিকালচারের উন্নয়নে পার্বত্য মন্ত্রণালয় যেমন বিশেষ গুরুত্ব দেয়, চর মন্ত্রণালয় চরের পলি ও বালু মিশ্রিত মাটির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারবে। চরের প্রধান শক্তি এর বিস্তীর্ণ চারণভূমি ও পলিমাটি। চরের জন্য বিশেষায়িত কৃষি সম্প্রসারণ নীতি তৈরি হবে। বিনা চাষে (Zero Tillage) ফসল উৎপাদন, ভুট্টা, বাদাম ও পেঁয়াজ চাষের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং বৃহৎ পরিসরে গবাদি পশু (গরু, মহিষ, ভেড়া) পালনের জন্য চরের মানুষের উপযোগী সহজ শর্তে ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা যাবে।
৪. স্থানান্তরযোগ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আবাসিক বিদ্যালয় এবং মোবাইল হেলথ ক্যাম্পের মতো চরেও বিশেষায়িত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। চরে স্থায়ী পাকা ভবন করলে তা নদীভাঙনে বিলীন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই চর মন্ত্রণালয় সহজে স্থানান্তরযোগ্য স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সুসজ্জিত ‘মেডিকেল বোট’ বা ভাসমান হাসপাতাল পরিচালনা করবে। এর ফলে চরের জমি ভেঙে গেলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ হবে না; অবকাঠামোটি সহজেই অন্য চরে সরিয়ে নেওয়া যাবে।
৫. জাতীয় বাজেটে ‘থোক বরাদ্দ’ ও একক জবাবদিহিতা
পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে আলাদা একটি বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ থাকে, যা কেবল ওই অঞ্চলের উন্নয়নেই ব্যয় হয়। চর মন্ত্রণালয় গঠিত হলে দেশের প্রায় ৭০-৮০ লাখ চরবাসীর জন্য প্রতি বাজেটে সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ নিশ্চিত হবে। তখন চরের উন্নয়নকে অন্য সাধারণ এলাকার সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে না। একই সঙ্গে, চরের উন্নয়নে কোনো স্থবিরতা দেখা দিলে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের ওপর দায় না চাপিয়ে সরাসরি এই মন্ত্রণালয়কে জবাবদিহি করা যাবে।
৬. চরের নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতি রক্ষা ও ‘চর ডাটাবেজ’ তৈরি
পাহাড়ের মানুষের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষায় যেমন কাজ হয়, তেমনি চরের মানুষের জীবনসংগ্রাম ও লোকসংস্কৃতির একটি জাতীয় স্বীকৃতি আসবে। বাংলা কথাসাহিত্যে চরাঞ্চলের জীবনচিত্র বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন— মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে পদ্মা নদী ও বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা দুর্গম চর ‘ময়না দ্বীপ’-এর মানুষের করুণ জীবনগাথা চিত্রিত হয়েছে। শহীদুল্লা কায়সারের সারেং বউ উপন্যাসে উঠে এসেছে উপকূলীয় চরাঞ্চলের মানুষের ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াই এবং চরের সামাজিক বাস্তবতা। অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে নদী শুকিয়ে চর পড়ার পর একটি জেলে জনপদের বিলীন হয়ে যাওয়ার মর্মস্পর্শী গল্প বলা হয়েছে। শওকত আলীর চর পীরবাজ উপন্যাসে চরের জমি, পলিমাটি এবং চর দখলকে কেন্দ্র করে শোষিত লাঠিয়াল ও কৃষকদের সংগ্রাম ফুটে উঠেছে। শওকত ওসমানের জননী উপন্যাসে চরের অতিদরিদ্র ও ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের টিকে থাকার পারিবারিক ও সামাজিক আখ্যান রয়েছে। দেবেশ রায়ের তিস্তা পারের বৃত্তান্ত উপন্যাসে উত্তরবঙ্গের তিস্তা নদীর চরাঞ্চল ও নদী অববাহিকার মানুষের জীবনের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বিবর্তন দেখানো হয়েছে। অমিয়ভূষণ মজুমদারের ধীবর উপন্যাসে নদী অববাহিকা ও চরের ধীবর (জেলে) সম্প্রদায়ের জীবনসংগ্রাম এবং হরিশংকর জলদাসের চর-কোলাহলের উপাখ্যান উপন্যাসে উপকূলীয় জেলে ও চরের প্রান্তিক মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই সমৃদ্ধ জীবন ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা এই মন্ত্রণালয়ের অন্যতম কাজ হবে।
লেখক: অধ্যক্ষ (পি আর এল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।