রংপুরে শীতের আগমনী হাওয়া বইতে শুরু করতেই জমে উঠেছে পিঠা-পুলির মৌসুমী ব্যবসা। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই শহর ও গ্রামাঞ্চলে শুরু হয়েছে পিঠার উৎসব। নতুন চালের গুঁড়ো, খেজুরের গুড়, নারিকেল ও দুধের গন্ধে মুখরিত হয়ে উঠেছে রংপুর বিভাগজুড়ে বাজার ও জনপদ।
রংপুর শহরের খামার মোড়, শাপলা চত্বর ও জাহাজ কোম্পানি মোড় এলাকায় ঘুরে দেখা যায়— বিকেল থেকেই পিঠার দোকানের সামনে লেগে থাকে ক্রেতাদের লম্বা লাইন। ভাপা, পাটিসাপটা, চিতই, দুধপুলি, নকশিপিঠা— সব ধরণের পিঠাই বিক্রি হচ্ছে দারুণ চাহিদায়।
দোকানি মনোয়ারা বেগম জানান, “শীত এলেই ব্যবসা জমে যায়। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত একটানা পিঠা বানাতে হয়; তারপরও চাহিদা কমে না।”
শহরের বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্টে চালু হয়েছে ‘উইন্টার পিঠা কর্নার’, যেখানে পাওয়া যাচ্ছে ৩০–৩৫ ধরনের পিঠা।
গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর, পীরগাছা, পীরগঞ্জ ও কাউনিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামের উঠোনে সন্ধ্যা নামতেই জ্বলে ওঠে মাটির চুলা। নবান্নের ধান ভাঁজাই করে পরিবার ও প্রতিবেশীদের নিয়ে পিঠা বানানোর আনন্দ যেন শীতের বিশেষ ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। ছোটদের হাসি-খেলা, বড়দের গল্পগুজবে রঙিন হয়ে ওঠে গ্রামীণ রাত।
শীতের পিঠার অন্যতম প্রধান উপকরণ খাঁটি খেজুরের গুড় সংগ্রহেও তুঙ্গে ব্যস্ততা। লালমনিরহাট, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, জলঢাকা ও কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ভোর থেকেই গাছ থেকে রস নামানো হচ্ছে।
গুড় বিক্রেতা সাইদুর রহমান বলেন, “শীত এলেই বিক্রি তিনগুণ বেড়ে যায়। খাঁটি গুড়ের জন্য মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আসে।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণদের পিঠা নিয়ে নানান ভিডিও ও নতুন রেসিপি ছড়িয়ে পড়ায় শীতের আমেজ আরও বেড়েছে। তরুণীরা ঘরে পিঠা তৈরি করে অনলাইনে ছবি ও রেসিপি শেয়ার করছেন, যা নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলছে।
রংপুরের অনেক নারী ঘরে বসেই পিঠা বানিয়ে নিচ্ছেন অনলাইন অর্ডার। ফেসবুক পেজ, স্থানীয় ফুড গ্রুপ এবং ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিদিন শতাধিক অর্ডার যাচ্ছে।
রওশন আরা, রংপুর মেডিকেল এলাকার গৃহিণী, জানান— প্রতিদিন ৭০–৮০টি পিঠা বিক্রি করে তিনি পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী অতিরিক্ত আয়ের পথ তৈরি করেছেন।
জেলার বিভিন্ন স্থানে চলমান পিঠা উৎসবগুলোতে যুক্ত হয়েছে লোকসংগীত, বাউল গান, নৃত্য ও নাটকসহ নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। রংপুর টাউন হল ময়দানে চলমান পিঠা উৎসবে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। আয়োজকদের মতে, এই উৎসব শুধু খাদ্য নয়; বরং বাংলার ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
পিঠা মৌসুমে খেজুর রস সংগ্রহ, গুড় উৎপাদন, চাল ভাঁজাই, উপকরণ বিক্রি, পিঠা তৈরি ও বিপণন— এসব কাজে রংপুর অঞ্চলের হাজারো মানুষ মৌসুমী আয়ের সুযোগ পান। নতুন ধানের বাজারেও কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।
সংস্কৃতি বিশারদদের মতে, পিঠা-পুলি কেবল মৌসুমী খাবার নয়; এটি বাংলা সমাজ, পরিবার ও সংস্কৃতির গভীর পরিচয়বাহী ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে পরিবার ও সমাজকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
লেখিকা: আবিদা সুলতানা রুকু
শিক্ষার্থী,গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর