ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কুড়িগ্রাম-১ আসনে (নাগেশ্বরী-ভুরুঙ্গামারী) সম্ভাব্য প্রার্থীরা জনসংযোগ শুরু করেছেন। যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক, পোস্টার আর বিলবোর্ডের মাধ্যমে নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরছেন। এবার এ আসনে বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। তবে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিলে বদলে যাবে সব হিসাব-নিকাশ।
জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস ইতোমধ্যে এ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জামায়াতের প্রার্থী সহকারী অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হারিসুল ইসলাম রনি। আর খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শহিদুল ইসলাম ফয়েজি। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে সবার আগে উচ্চারিত হচ্ছে সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য সাইফুর রহমান রানার নাম। তবে উপজেলা বিএনপি আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজা, ড্যাব নেতা ডা. ইউনুছ আলী ও ডা. মাহফুজার রহমান মারুফ মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এর বাইরে জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি মোস্তাফিজুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের বিন ইয়ামিন মোল্লাসহ কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থীও জনসংযোগ করছেন।
নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলা নিয়ে কুড়িগ্রাম-১ আসন। ২৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ২৯ হাজার ১৬৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬৩ হাজার ২৫৩ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৬৫ হাজার ৯০৭ জন। তৃতীয় লিঙ্গের তিনজন।
কুড়িগ্রাম-১ আসনটি নানা কারণে জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। এ আসনের জনপ্রিয় সংসদ সদস্য আ.খ.ম শহিদুল ইসলাম বাচ্চুর মৃত্যুর পর তার ভাগ্নে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি একেএম মোস্তাফিজার রহমান ৫ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আসলাম সওদাগরের কাছে হেরে গেলেও ২০২৪ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি মহাজোটের প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত হন।
এ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানা সব সময় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। ’৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে সামান্য ভোটে হেরে যান। যদিও তিনি অভিযোগ করেন ২০১৮ সালের নির্বাচনে কারচুপি করে তাকে হারিয়ে দেওয়া হয়। এই নির্বাচনি এলাকার দুধকুমারের ওপারের চরাঞ্চলের কয়েকটি ইউনিয়নে তার বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি এবার নিশ্চিত বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। এ আসনে এতদিন সাইফুর রহমান রানার একক আধিপত্য ছিল। তবে এখন সাইফুর রানার গ্রুপ ছাড়াও বিরোধী একটি গ্রুপ তাকে চ্যালেঞ্জ করছে। এই গ্রুপিং নিয়ে একাধিকবার সহিংসতাও হয়েছে। দুটি গ্রুপ একত্রিত না হলে ভোটের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ সুবিধা নিতে পারে বলে জানিয়েছে বিএনপির একাধিক সূত্র।
বিএনপির মনোনয়ন প্রার্থী সাইফুর রহমান রানা বলেন, সারা বছর আমাদের জনসংযোগ কার্যক্রম চলে আসছে। এখন আরও গতি বেড়েছে। যেখানেই যাচ্ছি, জনগণের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। তিনি জানান, দুধকুমারের ভাঙন রোধ, কালীগঞ্জে দুধকুমার সেতু, সোনাহাট স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট চালু ও কর্মসংস্থানের জন্য ইপিজেড স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। এছাড়া মাদক ও সন্ত্রাস প্রতিরোধ, সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে তার একগুচ্ছ পরিকল্পনা আছে।
নাগেশ্বরী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী গোলাম রসুল রাজা বলেন, আসনটিতে বিএনপির ভোটব্যাংক থাকলেও জোট-মহাজোটের কারণে বিএনপির প্রার্থী বারবার পরাজিত হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে আসনটি পাওয়ার জন্য আমরা জোরগতিতে কাজ করে যাচ্ছি। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতা ছিলাম। এরপর এলাকায় এসে যুবদলকে সংগঠিত করি। পরে বিএনপিকে সংগঠিত করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করি। দল আমার ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনপ্রিয়তা মূল্যায়ন করবে বলে আশাবাদী।
জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম রংপুর মডেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় ইউনিটের সদস্য এবং রংপুর মহানগর শাখার সাবেক নেতা। আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, জামায়াতে ইসলাম ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ কায়েম করতে চায়। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এলাকার প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি।
গণঅধিকার পরিষদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা এলাকায় সভা-সমাবেশ শুরু করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের সামনের কাতারের একজন নেতা হিসাবে এবং তরুণ প্রার্থী হিসাবে তিনি ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। দলের প্রার্থী হিসাবে তিনি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানসহ জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের দাবি নিয়ে উচ্চকণ্ঠ থাকবেন।
ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হারিসুল ইসলাম রনি বলেন, ‘জনসংযোগকালে জনগণের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন উন্নয়নবঞ্চিত ছিল। নির্বাচিত হলে নদীভাঙন রোধ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কাজ করব।’
বরাবরের মতো এবারও এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ভুরুঙ্গামারী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাই মাস্টার। এ লক্ষ্যে অব্যাহত রেখেছেন গণসংযোগ। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গেলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট পেয়ে চমক সৃষ্টি করেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনসহ আগের কয়েকটি নির্বাচনে জাকের পার্টির প্রার্থী হিসাবে নিজের প্রচার নিজেই করে আলোচনায় থাকেন তিনি।
কুড়িগ্রাম-১ আসনটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা, মাদক ও গবাদিপশু চোরাচালান রোধ জনপ্রতিনিধিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
রয়েছে বিশাল নদীপথও। নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারীর একাধিক ইউনিয়ন ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় গবাদি চোরাচালান, মাদক অনুপ্রবেশ এবং নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে। তরুণদের একটি অংশ মাদকে জড়িয়ে পড়ছে। এসব সমস্যা সমাধানে তরুণ ভোটাররা যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের জন্য মুখিয়ে আছেন।