স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলেও উন্নয়ন, সেবা ও অবকাঠামোগত সুবিধার বিচারে এখনও পশ্চাৎপদ অবস্থানে রয়েছে কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলা। জেলার অন্য অংশ থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন এই জনপদ যুগ যুগ ধরে প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কাঠামোর বাইরে থেকে গেছে। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, সড়ক যোগাযোগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এমনকি মৌলিক অধিকারেও এই অঞ্চলের মানুষ প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সম্প্রতি রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলাকে কেন্দ্র করে ব্রহ্মপুত্রের পূর্বপাড়ে একটি নতুন জেলা গঠনের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ মুক্তাঞ্চল ছিল এই অঞ্চল। অথচ স্বাধীনতার অর্ধশতক পরেও উন্নয়নের সূচকে এখানকার অবস্থান নাজুক। সরকারি সেবার প্রয়োজনে এখনো মানুষকে নদী পার হয়ে জেলা সদরে যেতে হয়, যা বর্ষা মৌসুমে হয়ে ওঠে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রশাসনিক কাঠামো ও কর্মসংস্থানের ঘাটতিতে এখানকার জীবনমান অত্যন্ত শোচনীয়। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের জন্য স্বতন্ত্র জেলা গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছে, যা ইতোমধ্যে জনগণের মধ্যে আশাবাদের সঞ্চার করেছে।
নতুন জেলার প্রস্তাবনায় চারটি উপজেলা এবং মোট ১৮টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে একটি কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। উত্তরের সাহেবের আলগা, নয়ারহাট, অষ্টমীরচর ও চর শৌলমারী ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হবে জাফরগঞ্জ উপজেলা। রৌমারী উপজেলাকে পুনর্গঠন করে এতে যুক্ত থাকবে রৌমারী সদর, বন্দবেড়, দাঁতভাঙা, শৌলমারী এবং যাদুরচর ইউনিয়নের অংশবিশেষ। রাজিবপুর উপজেলায় বর্তমান ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে যুক্ত হবে নতুন প্রস্তাবিত সায়েদাবাদ ইউনিয়ন, যা গঠিত হবে বিক্রিবিল, খেওয়ারচর, আগলারচর ও লাঠিয়ালডাঙ্গা অঞ্চলকে নিয়ে। দক্ষিণের ডাংধরা, চর আমখাওয়া, পার রাম রামপুর, মোল্লারচর ও এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হবে একটি নতুন উপজেলা, যার সম্ভাব্য নাম তারাটিয়া বা সানন্দবাড়ি।
এই উদ্যোগের অন্যতম প্রবক্তা রৌমারী উপজেলা বিএনপির সদস্য অধ্যক্ষ মাহবুবুর রশিদ মন্ডল বলেন, “রৌমারী-রাজিবপুরবাসীর এই দাবি রাজনৈতিক নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের প্রশ্ন। আমরা স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখাই এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।” তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে জনসংখ্যা, আয়তন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা, ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে তথ্যসংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও সংহতি থাকায় এ দাবিটি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উত্থাপন করাও সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একটি জেলা গঠিত হলে শুধু প্রশাসনিক সুবিধা নয়—এটি হবে একটি অঞ্চলভিত্তিক অর্থনৈতিক জাগরণের সূচনা। সরকারি অফিস ও অবকাঠামো নির্মাণ, সেবাকেন্দ্র সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে এই এলাকার সামাজিক সূচকগুলোও নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হবে। সেইসঙ্গে ব্রহ্মপুত্রপাড়ের মানুষ নতুন আশার আলো দেখতে পাবে।