মাটির স্পর্শে রংপুর: ডাকঘরের পাশের মৃৎশিল্পের দোকানে ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ

রংপুর শহরের পুরোনো ডাকঘর এলাকা—দিনভর মানুষের ভিড়, দোকানের সারি আর যানবাহনের শব্দে সরব। কিন্তু এই ব্যস্ততার ফাঁকেই রয়েছে এক টুকরো শান্ত শিল্প-বিশ্ব, যেখানে প্রবেশ করলেই বাতাসে ভেসে আসে মাটির আদিম গন্ধ। দোকানের নাম ‘মাটির ঘর’। রংপুরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পকে নতুন করে তুলে ধরার লক্ষ্যে কয়েক বছর আগে চালু হওয়া এই ছোট দোকানটি এখন শহরের একটি পরিচিত শিল্পকেন্দ্র।

দোকানে ঢুকে পাওয়া যায় অন্যরকম আবহ।দোকানের দরজার কাছ থেকেই সাজানো রয়েছে বিভিন্ন আকারের মাটির কলসি, ফুলদানি, অরনামেন্ট, শো-পিস ও ল্যাম্পশেড। দিনের আলোয় পণ্যগুলো যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। দোকানের এক কোণে সাজানো হ্যান্ডপেইন্টেড মগ, কাপে–সসার আর টব—যেগুলো ক্রমেই তরুণ ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় উঠে এসেছে।

গ্রাহক ইয়াসমিন আহমেদ বলেন, “রংপুরে মাটির মানসম্মত পণ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। ‘মাটির ঘর’ সে অভাব পূরণ করেছে। বিশেষ করে ঘর সাজানোর শো-পিসগুলো খুবই নান্দনিক।”

এক পরিবারের তিন প্রজন্মের মাটির গল্প
দোকানটির মালিক নাসির উদ্দিন। তার পরিবার তিন প্রজন্ম ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। নিজের দোকানে বসে তিনি যখন পণ্যের গল্প বলেন, তখন তার চোখে-মুখে ফুটে ওঠে এই শিল্পের প্রতি গভীর টান।
“মাটির কাজ শুধু ব্যবসা নয়, এটা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য,” বললেন তিনি। “এক সময় রান্নাঘরের হাঁড়ি–পাতিল থেকে শুরু করে সবকিছুই মাটির ছিল। এখন প্লাস্টিক আর স্টিলের যুগে চাহিদা কমেছে। তবে মানুষ আবার ঘর সাজাতে মাটির পণ্যের দিকে ফিরছে। তাই দোকানটা ধীরে ধীরে জমে উঠছে।”
নাসির উদ্দিনের বাবা এখনো নকশা বাছাই করেন, আর নাসির নিজেই কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট থেকে ভালো মানের মাটি সংগ্রহ করেন। গুণমান বজায় রাখাই তাদের প্রথম অগ্রাধিকার।

পণ্যে বৈচিত্র্য, নকশায় সৃজনশীলতা
‘মাটির ঘর’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পণ্যের বিশাল বৈচিত্র্য। এখানে পাওয়া যায়—
• ঐতিহ্যবাহী কলসি, হাঁড়ি ও ডালা
• আধুনিক নকশার ফুলদানি
• মাটির ঝাড়বাতি ও ল্যাম্পশেড
• হ্যান্ডপেইন্টেড মগ, জগ ও কফি কাপ
• টব, প্ল্যান্টার ও সজ্জা সামগ্রী
• শিশুদের খেলনার সেট, ছোট সাজানো কলসি
• দেয়াল ঝুলানোর আর্ট-পিস

পণ্যগুলোতে ব্যবহৃত রং লেড–ফ্রি, যা দীর্ঘস্থায়ী। স্থানীয় কয়েকজন শিল্পী নিয়মিত হাতে আঁকা ডিজাইনে সহযোগিতা করেন।দামের ক্ষেত্রেও দোকানটি বেশ যুক্তিসঙ্গত—ছোট শো-পিস ৫০–১৫০ টাকা, মাঝারি সাইজের টব ২০০–৫০০ টাকা, আর বড় সাজানো কলসি ৮০০–১২০০ টাকার মধ্যে। পরিবারের সবার জন্যই এখানে কিছু না কিছু পাওয়া যায়।

গ্রাহক সন্তুষ্টিই দোকানের আসল সাফল্য।দোকানটিতে গ্রাহকসেবার পরিবেশও বেশ প্রশংসনীয়। কারও পণ্যের নকশা–বাছাইয়ে দ্বিধা হলে মালিক নিজেই পরামর্শ দেন। পণ্যের ব্যবহারবিধিও বুঝিয়ে দেন ধৈর্য সহকারে। তাই অনেকেই একবার এলে দ্বিতীয়বার ফিরে আসেন।
নিয়মিত ক্রেতা সৌরভ ইসলাম জানান,
“ঘর সাজাতে মৃৎশিল্প ব্যবহার করতে ভালো লাগে। এখানে পণ্য ভ্যারাইটি অনেক বেশি, আর দামও সাধ্যের মধ্যে। তাই মাসে একবার হলেও আমি এখানে আসি।”

চ্যালেঞ্জ আছে, কিন্তু স্বপ্নও আছে
ব্যবসা ভালো হলেও মাটির কাজ নিয়ে নাসির উদ্দিনের কিছু দুশ্চিন্তা রয়েছে। নতুন প্রজন্ম এই পেশায় কম আগ্রহী হওয়ায় কারিগর সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি খরচ বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।
তবুও তিনি হাল ছাড়তে চান না।
“ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে,” বললেন তিনি। “আমি চাই রংপুরে মৃৎশিল্প আবার পুরোনো জায়গা ফিরে পাক। ভবিষ্যতে একটি ছোট প্রদর্শনীকেন্দ্র স্থাপন করার পরিকল্পনাও করছি।”
রংপুরের মতো দ্রুতবর্ধনশীল শহরে ‘মাটির ঘর’ শুধু একটি দোকান নয়—এটি ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও কারুশিল্পের সমন্বিত একটি জীবন্ত পরিসর। ব্যস্ত শহরের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে দোকানটি রংপুরবাসীকে মনে করিয়ে দেয়—আমাদের শেকড় এখনও মাটিতে, মাটির মধ্যেই সৌন্দর্য।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রংপুর ডাকঘরের পাশের এই মৃৎশিল্পের দোকানটি শুধু পণ্য কেনাবেচার স্থান নয়; এটি এক টুকরো শিল্প-ঐতিহ্যের জগৎ, যার অস্তিত্বই শহরের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে একটি ইতিবাচক সংযোজন।

লেখিকা : জান্নাতুল ফেরদৌস ইভা
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর।

Share With