পবিত্র কুরআনের সূরা আর-রহমানের ১৫ নং আয়াতে জ্বীন সৃষ্টির উপাদান সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ তাদের সৃষ্টি করেছেন ‘মারিজিন মিন নার’ বা আগুনের শিখা (ধূম্রহীন অগ্নি) থেকে। এছাড়া সূরা আল- জ্বীন, সূরা আল- আহক্বাফ, সূরা আল- হিজর এবং সূরা আন- নাসে এই রহস্যময় জাতি সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। সূরা সিজদার ১৩ নং আয়াত এবং অন্যান্য বর্ণনা অনুযায়ী, জ্বীনরা স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন এক জাতি; মানুষের মতোই তাদের কর্মের বিচার হবে এবং কিয়ামতের দিন তারা আল্লাহর আদালতে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। একজন মুসলিম, শিক্ষক এবং বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও তাত্ত্বিক গবেষণার আলোকে আমি জ্বীনের অস্তিত্বে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
আমার এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো জ্বীনের অস্তিত্বের একটি বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা প্রদান করা। বিজ্ঞান সাধারণত দৃশ্যমান, পরিমাপযোগ্য এবং প্রমাণযোগ্য জগত নিয়ে কাজ করে। অন্যদিকে জ্বীন হলো একটি অতীন্দ্রিয় বা অদৃশ্য সত্তা। তবে আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের কিছু ধারণা এই অদৃশ্য জগতের যৌক্তিক ভিত্তি তৈরিতে সাহায্য করে। আমরা সাধারণত দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা—এই তিন মাত্রা এবং চতুর্থ মাত্রা হিসেবে সময়ের মধ্যে বাস করি। কিন্তু স্ট্রিং থিওরি (String Theory) বা এম-থিওরি (M-Theory) অনুযায়ী মহাবিশ্বে অন্তত ১১টি মাত্রা থাকা সম্ভব। গাণিতিকভাবে এটি প্রমাণিত যে, উচ্চতর মাত্রার কোনো সত্তা খুব সহজেই আমাদের মতো ত্রিমাত্রিক প্রাণীর দৃষ্টির আড়ালে থাকতে পারে। এটি ধর্মীয় “অদৃশ্য” থাকার ধারণার একটি জোরালো গাণিতিক ভিত্তি।
মানুষের চোখ কেবল তড়িৎচৌম্বকীয় বর্ণালীর (Electromagnetic Spectrum) একটি ক্ষুদ্র অংশ (দৃশ্যমান আলো) দেখতে পায়। এর বাইরে অতিবেগুনি রশ্মি, অবলোহিত রশ্মি বা এক্স-রে আমরা দেখতে পাই না। যেহেতু জ্বীনরা শক্তি বা ‘ধূম্রহীন অগ্নি’ থেকে তৈরি, তাই তাদের শারীরিক গঠন এমন কোনো তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে হওয়া স্বাভাবিক যা আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো বস্তু যদি আলো প্রতিফলন বা শোষণ না করে সরাসরি নিজের ভেতর দিয়ে যেতে দেয়, তবে তা আমাদের সামনে থেকেও অদৃশ্য থাকবে।
জ্বীনদের সৃষ্টির উৎস হিসেবে ‘আগুন’ মূলত পদার্থের প্লাজমা (Plasma) অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। প্লাজমা হলো পদার্থের চতুর্থ অবস্থা, যা অত্যন্ত আয়নিত এবং উচ্চ শক্তিসম্পন্ন। গবেষকদের মতে, যদি কোনো বুদ্ধিমান সত্তা প্লাজমা বা বিশুদ্ধ শক্তি দিয়ে গঠিত হয়, তবে তাদের পক্ষে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে চলা এবং রূপ পরিবর্তন করা সম্ভব। মহাবিশ্বের প্রায় ৯৫% অংশই ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এবং ডার্ক এনার্জি (Dark Energy) দিয়ে গঠিত, যা এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিশাল রহস্য। এই অদৃশ্য ভাণ্ডারে জ্বীনের মতো প্রাণের অস্তিত্ব থাকা তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব নয়।
জ্বীনরা মানুষের চিন্তায় প্রভাব ফেলতে পারে—এই ধারণার একটি আধুনিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট (Quantum Entanglement) সূত্রে। এই সূত্র অনুযায়ী, দুটি কণা মহাবিশ্বের দুই প্রান্তে থাকলেও তারা একে অপরকে তাৎক্ষণিক প্রভাবিত করতে পারে। মানুষের মস্তিষ্ক যেহেতু সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক সংকেত বা নিউরনের মাধ্যমে কাজ করে, তাই শক্তির তৈরি কোনো সত্তার পক্ষে কোয়ান্টাম স্তরে আমাদের নিউরনের সাথে ‘এন্ট্যাঙ্গেলড’ হওয়া বা সংকেত আদান-প্রদান করা অসম্ভব নয়। আলবার্ট আইনস্টাইন এই দূরবর্তী প্রভাবকে “Spooky action at a distance” বলে অভিহিত করেছেন।
বিখ্যাত পারমাণবিক বিজ্ঞানী এবং রেডিওলজিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক ড. ইব্রাহিম বি. সৈয়দ তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, জ্বীনরা মূলত ইনফ্রারেড (Infrared) বা অবলোহিত বিকিরণের স্তরে অবস্থান করতে পারে। মানুষের চোখ যা দেখতে পায় না, কিন্তু সাপ বা কিছু প্রাণীর বিশেষ ‘পিট অর্গান’ (Thermal Sensors) থাকায় তারা এই বিকিরণ শনাক্ত করতে পারে। ড. সৈয়দের মতে, মানুষের পিনিয়াল গ্ল্যান্ড (Pineal Gland) সাধারণত উচ্চ কম্পাঙ্কের তরঙ্গগুলোকে ফিল্টার করে দেয় বলে আমরা তাদের দেখতে পাই না। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে বা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অবস্থায় এই পর্দা সরে যেতে পারে। জ্বীনগ্রস্ত ব্যক্তিদের ভেস্টিবুলার অর্গান নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো গবেষণা না থাকলেও, বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শরীরের ভারসাম্যের ত্রুটি বা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের উদ্দীপনা এই ধরণের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার একটি বড় কারণ হতে পারে।
জ্বীনদের চলাচল সম্পর্কে ইন্টারডাইমেনশনাল হাইপোথিসিস (IDH) অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিখ্যাত বিজ্ঞানী জ্যাক ভ্যালি (Jacques Vallée) এবং জে. অ্যালেন হাইনেক (J. Allen Hynek) প্রস্তাব করেছিলেন যে, অনেক অলৌকিক সত্তা আসলে অন্য কোনো মাত্রা (Dimension) থেকে আমাদের পৃথিবীতে আসে। উচ্চতর মাত্রার বাসিন্দা হলে তারা আমাদের দেয়াল বা কঠিন বস্তু ভেদ করে চলাফেরা করতে পারবে, যা কোয়ান্টাম টানেলিং (Quantum Tunneling) প্রক্রিয়ার মতো সহজ হতে পারে। অন্যদিকে, স্নায়ুবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু নিউবার্গ (Andrew Newberg) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, অতীন্দ্রিয় অনুভূতির সময় মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমে বিশেষ পরিবর্তন ঘটে, যা অদৃশ্য জগতের সাথে যোগাযোগের একটি জৈবিক যোগসূত্র হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, এক সময় মানুষ অণুজীব দেখতে পেত না যতক্ষণ না অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। ঠিক তেমনি, ভবিষ্যতে যদি আরও উন্নত ‘কোয়ান্টাম সেন্সর’ আবিষ্কৃত হয়, তবে জ্বীন জগতের রহস্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হতে পারে। বিজ্ঞান এবং ধর্মতত্ত্বের পথ আলাদা হলেও তারা একই পরম সত্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই রহস্য সমাধানে পদার্থবিদ, মনোবিজ্ঞানী এবং ধর্মতত্ত্ববিদদের সমন্বিত গবেষণা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।