বিচারকের আসনটি ন্যায়বিচারের প্রতীক। কিন্তু সেই আসনে বসা মানুষটি যখন গৃহকোণে কেবল একজন ‘অন্ধ পিতা’ হয়ে ওঠেন, তখন সমাজের মেরুদণ্ড ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। সম্প্রতি একজন বিচারক কর্তৃক তার সন্তানকে শাসন করার অপরাধে একজন শিক্ষককে অপমান করার ঘটনাটি আমাদের বিবেককে এক ভয়াবহ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আমরা কি তবে স্নেহের নামে উত্তরসূরিদের অন্তরে ঔদ্ধত্য আর অন্যায়ের বিষবৃক্ষ রোপণ করছি?
আমাদের সমাজে এমন অনেক পিতা আছেন যারা নিজে হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা পাননি, কিন্তু হাড়ভাঙা খাটুনি আর কঠোর শৃঙ্খলায় সন্তানকে মানুষ করেছেন। তারা জানতেন, সন্তানকে কেবল সোহাগ দিলে সে লক্ষ্যহীন ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে, আর কেবল শাসনে রাখলে সে বিদ্রোহী বা আত্মবিশ্বাসহীন হয়। একজন আদর্শ পিতা শাসনের মাধ্যমে সন্তানের চরিত্রের ‘ভিত্তি’ গড়েন আর সোহাগের পরশে তাতে ‘প্রাণ’ সঞ্চার করেন। এই দুয়ের ভারসাম্য নষ্ট হলে তা কেবল পরিবারের জন্য নয়, বরং গোটা রাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। যারা ‘ভালোবাসার খাতিরে’ সন্তানের অন্যায় আবদার বা ঔদ্ধত্যকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, ইতিহাস সাক্ষী—তাদের প্রত্যেককেই চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা দেখি, সম্রাট আকবর বিশ্বজয়ী এক মহান শাসক হয়েও পিতা হিসেবে ছিলেন বড় বেশি অসহায়। দীর্ঘ আরাধনার পর পাওয়া আদরের সেলিমকে তিনি আগলে রেখেছিলেন অন্ধ মোহে। সেলিমের মদ্যপান কিংবা উচ্ছৃঙ্খলতা—সবকিছুই তিনি মুখ বুজে সয়েছেন শুধু “সন্তান কষ্ট পাবে” এই ভয়ে।
কিন্তু সম্রাটের এই সীমাহীন প্রশ্রয়ই সেলিমের অন্তরে অবাধ্যতার বিষবৃক্ষ রোপণ করেছিল। সেই অন্ধ স্নেহের মাশুল ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। যখন সেলিমের নির্দেশে আকবরের পরম বন্ধু আবুল ফজলকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, সম্রাট শোকে পাথর হয়েও শেষ পর্যন্ত ‘বিচারক’ সত্তার চেয়ে ‘পিতৃত্ব’কেই বেছে নিলেন। সেই বিচারহীনতাই সেলিমের তলোয়ারকে খোদ পিতার বিরুদ্ধে উদ্যত করার স্পর্ধা জুগিয়েছিল। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সজল চোখে আকবর বুঝেছিলেন—অবিচারকে ক্ষমা করা ছিল তাঁর জীবনের চরম ভুল। এক বুক হাহাকার আর গভীর একাকীত্ব সঙ্গী করেই এই মহান সম্রাটকে বিদায় নিতে হয়েছিল।
একই করুণ পরিণতি আমরা দেখি ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় হেনরির জীবনে। সন্তানদের অকালেই ক্ষমতার স্বাদ দিয়ে তিনি নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে এনেছিলেন। স্নেহের আতিশয্যে সাম্রাজ্য ভাগ করে দিয়ে ভেবেছিলেন তারা দক্ষ হয়ে উঠবে; কিন্তু সেই ক্ষমাই সন্তানদের মনে রাজসিংহাসনের প্রতি সীমাহীন লোভ আর পিতার প্রতি ঘৃণা জাগিয়ে তোলে। ছেলেরা যখন বাবার বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরল, হেনরি তখনও কঠোর না হয়ে বার বার আলোচনার পথ বেছে নিয়েছেন। এমনকি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পুত্র ‘জন’ যখন বিদ্রোহীর খাতায় নাম লিখিয়ে পিতার মৃত্যু পরোয়ানায় সই করল, তখন হেনরির বাঁচার ইচ্ছাই শেষ হয়ে যায়। মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে তিনি কেবল বিড়বিড় করছিলেন, “লজ্জা, একজন পরাজিত রাজার ওপর লজ্জা!” একজন প্রতাপশালী সম্রাটকে শেষ বিদায়ের সময় প্রায় অর্ধনগ্ন অবস্থায় পড়ে থাকতে হয়েছিল, কারণ তাঁর ভৃত্যরা তাঁর রাজকীয় পোশাক ও অলঙ্কার পর্যন্ত লুট করে নিয়েছিল।
বিদ্রোহী পুত্র রিচার্ড যখন পিতার কফিনের সামনে দাঁড়ান, তখন মৃত হেনরির নাক দিয়ে তাজা রক্ত ঝরতে শুরু করে। মধ্যযুগের বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি ছিল ঘাতকের সামনে মৃত ব্যক্তির নীরব প্রতিবাদ। রিচার্ড কেঁদেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে ইতিহাসের পাতা থেকে পিতার সম্মান ধুলোয় মিশে গেছে।
আজকের এই অস্থির ও বস্তুবাদী পৃথিবীতে আব্রাহাম লিংকনের সেই ঐতিহাসিক চিঠিটি কেবল একটি আবেদন নয়, বরং এক চিরন্তন জীবনদর্শন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর সন্তান যেন ‘রাষ্ট্রপতির ছেলে’ হিসেবে কোনো রাজকীয় সুযোগ না পায়, বরং কঠোর জীবনসংগ্রামের আগুনে পুড়ে একজন খাঁটি মানুষ হয়ে ওঠে। শিক্ষকের কাছে তাঁর আকুল আরজি ছিল—তাঁর সন্তান যেন শেখে যে, কুড়িয়ে পাওয়া পাঁচ ডলারের চেয়ে ঘাম ঝরিয়ে উপার্জিত একটি ডলার অনেক বেশি সম্মানের। তাকে যেন শেখানো হয় কীভাবে মাথা উঁচু করে পরাজয় মেনে নিতে হয় এবং বিজয়ের মুহূর্তে বিনয়ী থাকতে হয়।
লিঙ্কন চেয়েছিলেন তাঁর পুত্র যেন বিবেকের ‘সত্যের ছাঁকুনি’ দিয়ে সবকিছু ছেঁকে নিতে শেখে। সে যেন নিজের মেধা আর শ্রমকে চড়া দামে বিক্রি করার সাহস রাখে, কিন্তু নিজের বিবেক আর আত্মাকে যেন কোনো প্রলোভনেই বিক্রি না করে।
পরিশেষে বলতে চাই, বিচারক যখন নিজের পদের দাপটে শিক্ষকের কণ্ঠরোধ করেন, তখন তিনি আসলে তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেন। শিক্ষক তো সেই কারিগর, যিনি শাসনের নিপুণ ছোঁয়ায় পাথর কেটে মানুষ গড়েন। সেই কারিগরকে অপমান করা মানেই সন্তানের মনে এই ধারণা গেঁথে দেওয়া যে—ক্ষমতা থাকলে আইন আর নৈতিকতা তুচ্ছ। মনে রাখবেন, আজকের এই ‘অন্ধ স্নেহ’ কালকের ‘সেলিম’ কিংবা ‘রিচার্ড’ তৈরি করছে না তো? ইতিহাস কিন্তু কাউকে ক্ষমা করে না। স্নেহের বাঁধন যেন শাসনের রাশ ছিঁড়ে না ফেলে—আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের প্রার্থনা।
লেখক: অধ্যক্ষ ( পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ ,কুড়িগ্রাম।