কুড়িগ্রামের মানচিত্রের প্রতিটি ধূলিকণা আমাদের অভিন্ন অস্তিত্বের অংশ। আমাদের স্বপ্ন ছিল এই অবহেলিত জনপদের প্রতিটি প্রান্তর নতুন নতুন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের আলোয় আলোকিত হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে কর্মসংস্থানের জন্য আমাদের উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি হলো; (১) কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিলস (২) ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য স্থল বন্দর,(৩) উচ্চ শিক্ষার জন্য কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথমটির অস্তিত্ব নেই, ২য় টিতে শুধুমাত্র পাথরের ব্যবসা, ৩য় টির স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্ধারিত হয়েছে কুড়িগ্রাম সদরের নালিয়ার দোলা। দীর্ঘ চার বছরে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ফাইলে বন্দী হয়ে আছে। কিন্তু দু:খের বিষয় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নিয়ে জেলাবাসীর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের সম্পর্ক আলগা হওয়ার পথে যা মোটেই কাম্য নয়। কিন্তু এ করুন দু:খজনক অবস্থার জন্য দায়ী কারণ কি? কারণ জানতে কিছু কাল্পনিক প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।
ধরা যাক কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নালিয়ার দোলায়, কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিলস সচল , কুড়িগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রাজারহাটের ইটাকুড়িতে, কুড়িগ্রাম মেডিকেল কলেজ রাজারহাটের ছিনাইয়ের এলজিডিইতে, টেক্সটাইল ইজ্ঞিনিয়ারিং কলেজ দাশের হাটে, টগরাইহাটে যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানী, ধরলার পাড়ে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, কুড়িগ্রাম ইকোনোমিক জোন ভোগডাঙ্গা আরজি পাড়ায় জনসাধারণের প্রত্যাশা মোতাবেক প্রতিষ্ঠিত হলো। এ জায়গা গুলোর নাম বলার উদ্দেশ্য হলো কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরুর সময় থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় এ কয়েকটি জায়গার নাম শোনা যাচ্ছিল। আশা করি আমরা সবাই সন্তুষ্ট । কিন্তু আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাকি আছে সেগুলো হলো – (১) কুড়িগ্রাম নকশি কাথা পল্লী ইনস্টিটিউট, (২) কুড়িগ্রাম হাই টেক পার্ক, (৩) ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল (৪) কুড়িগ্রাম ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র (৫) কুড়িগ্রাম সাংস্কৃতিক পল্লী, (৬) কুড়িগ্রাম আধুনিক স্টেডিয়াম (৭) কুড়িগ্রাম পর্যটন কেন্দ্র (ব্রহ্ম পুত্র নদীর তীরে) (৮) বাংলাদেশ টেলিভিশন উপকেন্দ্র (৯) এগ্রো প্রসেসিং জোন, (১০) ফারভেন্ট মাল্টিবোর্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (১১) জিল বাংলা চিনি কল (১২) সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র (১৩) আরডআর এস কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ইত্যাদি। এ অতিরিক্ত প্রতিষ্ঠান গুলো কোন জায়গায় হবে তা সম্মানিত পাঠকগণ ঠিক করে দিবেন।
প্রিয় পাঠক, আপনারা হয়তো ভাবছেন আমি জোক করছি, মোটেই না। যে প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম উল্লেখ করিছি তা যদি সত্যিই আমাদের থাকত তাহলে আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কি টানাটানি করতাম? এ প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের সারা জেলায় থাকলে আমাদের কতই না উপকার হতো। তাহলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো কোন জেলায় আছে? এ সবের উত্তর পেতে যেতে হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্রতম উপজেলা কুড়িগ্রামের রাজিবপুর। রাজিবপুর যেয়ে একটু পরে পাওয়া যাবে জামালপুর জেলা। এ প্রতিষ্ঠানগুলো সবই তাদের অর্জন। আপনাদের দেখাতে আমাকে সিলেট বা চট্রগ্রাম বিভাগে যেতে হয় নি। এটি একবারেই বাড়ির কাছের প্রতিবেশি জেলা।
এখন প্রশ্ন হলো তাঁরা পেল কিভাবে আর আমাদের নেই কেন? কাউকে কোনরুপ দোষারোপ না করে সহজ উত্তর হলো আমাদের দূর্ভাগ্য। আমাদের ভাগ্য খারাপ তাই হয় নি। তবে ভাগ্য খারাপ নিয়ে বসে থাকলে তো হবে না। ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্ঠা অবশ্যই আমদেরকে করতে হবে। কুড়িগ্রামের বর্তমান প্রজন্ম এবং আমাদের নেতৃত্বে যারা আছেন সকলে মিলে ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করা ছাড়া আমাদের কোন উপায় নেই।
নেতৃত্ব হলো একটি দ্বিধারী তলোয়ার। ভালো কাজ করলে তার সুফল সাধারণ মানুষ পায় এবং নেতা অমর হন। কিন্তু ক্ষমতার মোহে বা ভুল চিন্তায় করা একটি খারাপ কাজ ইতিহাসের পাতায় কালো কালিতে লেখা থাকে, যা কোনো ক্ষমা বা সংশোধনে মোছা সম্ভব হয় না।
নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা এবং কর্মফলের অনিবার্য পরিণতি নিয়ে সাহিত্য এবং ইতিহাসে অনেক শক্তিশালী উদাহরণ রয়েছে। একজন নেতার একটি ভালো সিদ্ধান্ত যেমন হাজারো মানুষের মুখে হাসি ফোটায়, তেমনি একটি ভুল বা অহংকারী পদক্ষেপ তাকে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে। ইসলামী ইতিহাসের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর জীবন ছিল নেতৃত্বের দায়বদ্ধতার এক জীবন্ত দলিল। তিনি বলেছিলেন—”ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায়, তবে তার জন্যও হাশরের ময়দানে উমরকে জবাবদিহি করতে হবে।”
রুশ লেখক ম্যাক্সিম গোর্কির ‘ওল্ড ওম্যান ইজারগিল’ গল্পের ‘দানিয়ো’ চরিত্রটি নিঃস্বার্থ নেতৃত্বের এক অনন্য প্রতীক। দানিয়োর গোত্র যখন অন্ধকার অরণ্যে আটকা পড়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছিল, তখন দানিয়ো তাদের পথ দেখিয়ে বের করার দায়িত্ব নেয়। দীর্ঘ পথে ক্লান্ত ও ক্ষিপ্ত মানুষগুলো যখন দানিয়োকে গালিগালাজ করতে শুরু করে এবং তাকে মেরে ফেলতে চায়, তখন দানিয়ো কোনো পাল্টা আঘাত করেনি। সে নিজের বুক চিরে জ্বলন্ত হৃৎপিণ্ড বের করে আনে এবং সেই আলোর সাহায্যে মানুষকে অন্ধকার বন থেকে বের করে আনে। মানুষ মুক্তি পায়, কিন্তু দানিয়ো মারা যান। এখানে দানিয়ো জানতেন তার এই ত্যাগের ফলেই জাতি রক্ষা পাবে। নেতৃত্বের মহত্ত্ব এখানেই—ব্যক্তিগত ক্ষতি স্বীকার করেও সমষ্টির মঙ্গল নিশ্চিত করা। জন সি. ম্যাক্সওয়েল বলেছেন “নেতৃত্ব মানে পদবী নয়, নেতৃত্ব হলো দায়িত্ব। শেখ সাদী (র.): এর মতে “এমনভাবে জীবন যাপন করো যেন তোমার মৃত্যুর পর মানুষ তোমার জন্য কাঁদে, আর তুমি হাসো। এমন নেতৃত্ব দিও না যাতে তোমার বিদায়ে মানুষ আনন্দ প্রকাশ করে।
কুড়িগ্রামের বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মের পক্ষ থেকে আমাদের বিনীত অনুরোধ—একটি মীমাংসিত বিষয় নিয়ে নতুন করে বিবাদে জড়াবেন না। এতে ভাইয়ে-ভাইয়ে সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে, যা আমাদের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।কুড়িগ্রামের উন্নয়ন কেবল একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের দাবি হোক পুরো জেলায় জামালপুরের মতো অসংখ্য শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। আপনাদের সিদ্ধান্তে যেন হাজারো মানুষের মুখে হাসি ফোটে, রক্তক্ষরণ নয়। আপনারা আমাদের শ্রদ্ধা আর সম্মানের শিরোমনি।
লেখক: অধ্যক্ষ (পিআর এল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।