সৈকত খন্দকার। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
বিশ্ববিদ্যালয় মানেই যেখানে স্বপ্ন দেখার জায়গা, সেখানে এখন জেঁকে বসেছে হতাশা আর অবসাদের কালো ছায়া। শিক্ষাজীবনের কঠিন বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন এক শ্রেণির শিক্ষার্থী। এই হতাশা থেকেই কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছেন মাদকসেবনে, গড়ে উঠছে আস্ত মাদকের আখড়া—বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রাঙ্গণজুড়ে।
সন্ধ্যা নামতেই আবাসিক হলগুলোতে জমে উঠছে আড্ডার আসর। কেউ কফির কাপে, কেউবা সিগারেটের ধোঁয়ায় স্বস্তি খোঁজেন। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কেউ কেউ আশ্রয় নিচ্ছেন গাঁজা, ইয়াবা কিংবা ফেনসিডিলের মতো ভয়াবহ মাদকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থী বলেন,
“সারাদিন ক্লাস শেষে হলে ফিরলেই চারদিক গাঁজার গন্ধে ভরে যায়। মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করাটাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গণ্ডি পেরোনোর আগেই চাকরি না পাওয়ার ভয়, প্রতিযোগিতার চাপে জর্জরিত ক্যারিয়ার পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা দিন দিন বাড়ছে। এই সুযোগটাই নিচ্ছে মাদকচক্র। অভিযোগ রয়েছে, কিছু সিনিয়র শিক্ষার্থী ও বহিরাগত মাদক ব্যবসায়ী এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বহু হলে গড়ে উঠেছে গোপন আড্ডা।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও তা নিয়মিত নয়, আর অনেক সময় রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে প্রশাসন পড়ছে সংকটে। অন্যদিকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বা কাউন্সেলিং সাপোর্টের অভাব শিক্ষার্থীদের আরও বেশি বিপর্যস্ত করে তুলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন,
“হতাশা থেকে যখন কেউ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে, তখন তাকে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দরকার সমন্বিত ও বহুমাত্রিক পদক্ষেপ। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই সংকট সমাধানে নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও কাউন্সেলিং সেন্টার চালু ও সক্রিয়করণ, শিক্ষার্থীদের চাকরিপ্রস্তুতিতে গাইডলাইন ও নিয়মিত কর্মশালা, আবাসিক হলগুলোতে নিয়মিত নজরদারি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অভিযান, ক্যারিয়ারভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কোর্স, নৈতিক ও ধর্মীয় চর্চার পরিবেশ তৈরি সহ নিতে ইতিবাচক কর্মশালা।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা যদি নিজস্ব লক্ষ্য স্থির না করেন, তবে পথ হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা থেকেই যায়। এই সমস্যা শুধু প্রশাসনের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রশাসন ও পুরো সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
অন্যথায়, মেধার বাতিঘরগুলোই একদিন পরিণত হবে ধ্বংসস্তূপে।