বেরোবিতে মাদকের কালো ছায়া, নীরব ভূমিকায় প্রশাসন

দীপ্ত চন্দ্র সরকার। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

জাতি গঠনের অন্যতম ও প্রধান কেন্দ্রস্থল হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় তারই সর্বোচ্চ স্তর। দেশসেরা মেধাবীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়। কিন্তু, জাতি গঠনের এইসব প্রধান সূতিকাগার আজ মাদকের ভয়াল থাবার খপ্পরে। মাদক সংশ্লিষ্ট কিছু বিশেষ শব্দ, যেমনঃ জয়েন্ট, নিমাই খেলা, স্টিক, র-পেপার, বাঁশি ইত্যাদি এক শ্রেণির বিশেষ শিক্ষার্থীর নিকট বহুল পরিচিত এবং দৈনন্দিন চর্চার বিষয়। দেশের বেশিরভাগ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চিত্র এটি। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও এই সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। উপরন্তু, এখানে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মাদক গ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা। অথচ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদক্ষেপ অনেক সময়েই পর্যাপ্ত ও কার্যকর মনে করছে না সংশ্লিষ্টরা।


শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচলিত মাদকগুলো হলো- গাঁজা, ফেন্সিডিল, ইয়াবা, হেরোইন ইত্যাদি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষার্থী জানান, “বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইদের মাধ্যমে আমি প্রথম মাদক গ্রহণ করি। এটি গ্রহণ করার ফলে অনেক কষ্ট সাময়িক ভুলে থাকা যায়।” এছাড়াও বন্ধুদের প্ররোচনায় এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত হতাশার ফলশ্রুতিতে অনেকে এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছে।


বিশ্ববিদ্যালয়ের হল এবং সরদারপাড়া ও চকবাজার এলাকার বিভিন্ন ছাত্রাবাসে নিয়মিত বসে মাদকের আসর। এছাড়াও, দিনের বিভিন্ন সময়ে ও গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের স্বাধীনতা স্মারক, হতাশা চত্বর, ফুটবল মাঠ, ভিসি মাঠ এলাকায় লোকচক্ষুর আড়ালে অনেক শিক্ষার্থীকে মাদক গ্রহণ করতে দেখা যায়। রংপুর নগরীর মডার্ন মোড়, লালবাগ কেডিসি রোড, রেলস্টেশন সংলগ্ন বস্তি এলাকা, এরশাদ নগর, সাতমাথা প্রভৃতি স্থানে সহজেই মেলে গাঁজা সহ বিভিন্ন ধরণের মাদক।
“মাদক প্রধানত মস্তিষ্ক এবং বৃহৎ অর্থে শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি করে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি সমাজ এবং পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং বিভিন্ন ধরণের ‘সোশ্যাল ক্রাইম’ এ জড়িয়ে যেতে পারে। এটি ব্যক্তিকে হতাশায় নিমজ্জিত করে আত্মহত্যার দিকে পর্যন্ত ঠেলে দিতে পারে” বলে জানান বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর এর মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক ডাঃ অলোক কুমার দাস।


জানতে চাইলে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর এর সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, “এটি খুবই আশঙ্কাজনক যে, মাদক একটি শিক্ষার্থীর শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতিসহ তার পরিবারকেও ধ্বংসের সম্মুখীন করে। মাদকের সহজলভ্যতা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বিদ্যমান হতাশা মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। কয়েকজন মাদকসেবি শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে প্রশাসনকে একটি উদাহরণ সেট করতে হবে, যেন পরবর্তীতে কোনো শিক্ষার্থী মাদক গ্রহণে ভয় পায়। মাদকবিরোধী প্রচার প্রচারণা আরও জোরদার করতে হবে।”

তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. ফেরদৌস রহমান জানান, “ক্যাম্পাসে প্রক্টোরিয়াল বডি সর্বদা সক্রিয় রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ইতোপূর্বে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়েছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আবারও অভিযান পরিচালিত হবে। কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মাদক গ্রহণের অভিযোগ পেলে এবং তা ডোপ টেস্টে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”


কথায় আছে, “নেশা, নারী, তাস- তিলে তিলে সর্বনাশ।” তরুণদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় তাই সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা একান্ত কাম্য।

Share With