কুড়িগ্রামের চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুরের সাতজন জেলে মাছ ধরতে গিয়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে ভারতের একটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাদের আটক করে বিএসএফ। এদিকে জেলেদের পরিবারগুলো অভাব-অনটনে দিনাতিপাত করছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হলেও তারা দাবি করছেন—ত্রাণ নয়, প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপে যেন তাদের স্বজনদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
গ্রেপ্তার জেলেরা হলেন—চিলমারী উপজেলার রমনা মডেল ইউনিয়নের হরিনের বন্দ এলাকার মৃত আবুল হোসেনের ছেলে রাসেল মিয়া (৩৫), রমনা ব্যাপারীপাড়া এলাকার বাহাদুর মিয়ার ছেলে বিপ্লব মিয়া (৪৫), শামছুল হকের ছেলে মীর জাহান আলী (৪৫), মৃত এছাহক আলীর ছেলে বকুল মিয়া (৩২), পকের আলীর ছেলে আমির আলী (৩৫), রাজিবপুর উপজেলার বালিয়ামারী ব্যাপারীপাড়ার জরিপ উদ্দিনের ছেলে আঙ্গুর হোসেন (২০) এবং রৌমারী উপজেলার যাদুর চর বকবান্ধা এলাকার ছলিম উদ্দিনের ছেলে চাঁন মিয়া (৬০)।
জানা গেছে, গত বছরের ৪ নভেম্বর চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার এ সাত জেলে মাছ ধরতে গিয়ে ভুলবশত ভারতের সীমানায় প্রবেশ করলে বিএসএফ তাদের আটক করে মেঘালয়ের কালাইচরে পাঠায়। ভারতীয় এক আইনজীবীর মাধ্যমে তাদের ছাড়ানোর চেষ্টা চলছে। সর্বশেষ শুনানি হয়েছে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল। তবে আর্থিক সংকটে পড়ায় পরিবারগুলো আইনজীবীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে পারছেন না।
গ্রেপ্তার জেলে রাসেলের খালা রেজিয়া বেগম জানান, তারা মাঝেমধ্যেই আসামে মাছ ধরতে যেতেন। রাসেলের দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে এখন মানুষের বাসায় কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। রাসেল ধরা পড়ার পর তার স্ত্রী দুই সন্তান নিয়ে ঢাকার রায়েরবাজারে বাসাবাড়িতে কাজ করছেন। রাসেলের ভাই আহসানুল ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করেন। এর আগে ইউএনও একবার কিছু চাল দিয়েছিলেন।
প্রতিবেশী আকবর আলী জানান, রাসেলের পরিবার চরম কষ্টে আছে। সরকার যদি দ্রুত তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে, তাহলে ভালো হয়।
গ্রেপ্তার জেলে বকুল মিয়ার সংসার জীবনের বয়স নয় বছর। জীবিকার তাগিদে প্রতিবছর ভারতে গিয়ে মাছ ধরতেন। কিন্তু এবার বৈধ কাগজপত্র না থাকায় অনুপ্রবেশের অভিযোগে বিএসএফের হাতে ধরা পড়েন। তার স্ত্রী আজেদা বেগম জানান, সেলাইয়ের কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছেন। স্বামীকে জেল থেকে ছাড়াতে আইনজীবী জন প্রতি দুই লাখ টাকা দাবি করেছেন। “এত টাকা কই পাই? আইনজীবীর ফোন দিয়ে দু’বার স্বামীর সঙ্গে কথা হয়েছে,” বলেন আজেদা।
বকুলের ভাবি ফুলেমা বেগম বলেন, “আল্লায় চালায়, মাইনষে সাহায্য দেয় তাই খাইয়া জীবন চলে। রিলিফের খাবার খাইয়া আর কয়দিন চলবো? সরকার যদি বন্দিদের ফেরত আনার ব্যবস্থা করত, ভালো হতো।” তার খালাতো ভাই আমির আলীও একই মামলায় কারাগারে আছেন।
জেলে পরিবারগুলো জানান, “আমাদের লোকজন ১১ মাস ধরে ঘরছাড়া। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক। ধরা পড়ার পর একবার ৫ হাজার টাকা, ঈদের আগে ২ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছি।”
ইউপি সদস্য রকুনুজ্জামান স্বপন বলেন, “দুই দেশের সম্পর্ক ভালো না থাকায় তারা আটকা পড়েছেন। আগের মতো সম্পর্ক থাকলে সমস্যা হতো না। তারা ভিসা নিয়ে গিয়ে মাছ ধরে, তারা তো চুরি করে না—জীবিকার জন্যই যায়।”
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক জানান, “লিখিতভাবে জেলেদের বিষয়ে জেলা প্রশাসনে পাঠানো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেভাবে পারছি সহযোগিতা করছি। এছাড়া যেকোনো সহযোগিতা এলে তাদের বিষয়টি আগে বিবেচনা করা হবে।”