অধ্যক্ষ ঢাকায়, অফিস সহকারী দিয়ে চলছে কলেজ!

কলেজের ভবন আছে, জাতীয় পতাকাও প্রতিদিনই উত্তোলন হয়। কিন্তু নেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি। অধ্যক্ষও নিয়মিত কলেজে আসেন না, থাকেন ঢাকায় কিংবা নীলফামারীতে।

এভাবে অফিস সহকারী ও আয়া-পিয়নের আনুষ্ঠানিক উপস্থিতিতেই চলছে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার কিসমত উল্লাহ বালাজান কৃষি ও কারিগরি ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম। উপজেলা পরিষদ থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে মির্জাপাড়া এলাকায় রৌমারী-ঢাকা মহাসড়কের পাশে প্রায় দুই একর জায়গাজুড়ে চকচকে সাইনবোর্ড টানিয়ে নামমাত্র কার্যক্রম চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সাইনবোর্ডে লেখা আছে সাংবাদিক ফোরাম কর্তৃক পরিচালিত। তবে ঠিক কোন ফোরাম, তার খোঁজ মেলে না।

তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে চার বছর মেয়াদি কৃষি ডিপ্লোমা ট্রেড নিয়ে কলেজটি যাত্রা শুরু করে। ২০১৯ সালে অধ্যক্ষ, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টসহ মোট সাতজন এমপিওভুক্ত হন। পরে আরও একজন কর্মচারী এমপিওভুক্ত হলেও কোনো শিক্ষক এমপিওভুক্ত হননি। সম্প্রতি এনটিআরসিএ কর্তৃক নয়জন শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এমপিওভুক্ত হলেও অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন নিয়মিত কলেজে উপস্থিত থাকেন না। শুধু পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের সময় তাকে দেখা যায়। মাঝে মাঝে খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে ক্লাস চালানো হলেও পুরো ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অফিস সহকারী আমজাদ হোসেনের হাতে। ভর্তি, ক্লাস, পরীক্ষা সব কিছুই তার তত্ত্বাবধানে চলে।

অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন ঢাকায় ও নিজ জেলা নীলফামারীতে থাকেন। শুধু পরীক্ষার সময় কলেজে আসেন। অন্যদিকে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট রফিকুল ইসলাম ঢাকার শেওড়াপাড়ায় একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করেন। সেখানেই থাকেন তিনি। ফলে কার্যত কলেজ চালাচ্ছেন অফিস সহকারী আমজাদ।

কলেজের সদ্য সাবেক এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভর্তি হয়েছিলাম, কিন্তু ক্লাস করার প্রয়োজন হয়নি। শুধু পরীক্ষা দিয়ে সনদ নিয়েছি।

কলেজসংলগ্ন এলাকার এক বাসিন্দা জানান, শুধু পরীক্ষার সময় কলেজ সচল থাকে, বছরের বাকি সময় কার্যত বন্ধ। অফিস সহকারী আমজাদের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের সখ্য রয়েছে। কেউ মুখ খুললে মামলা-হামলার ভয় দেখানো হয়। ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট রফিকুল ঢাকায় থাকলেও নিয়মিত বেতন নেন। এসব সহজেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বের করা সম্ভব, কিন্তু তদন্ত করবে কে?

অফিস সহকারী আমজাদ হোসেন অধ্যক্ষের নিয়মিত কলেজে উপস্থিত না থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও অন্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নেওয়া হয়। বর্তমানে বোর্ড পরীক্ষা শেষ হওয়ায় ক্লাস নেই। নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি চলছে। অধ্যক্ষ স্যার বর্তমানে না এলেও তিনি কলেজে আসেন।

সাংবাদিক ফোরাম কর্তৃক পরিচালিত লেখা প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নজমুল হক সরকার ঢাকার একটি দৈনিক পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক। তারাই কলেজটি গড়ে তুলেছেন, এজন্য সাইনবোর্ডে ওইভাবে লেখা রয়েছে। অধ্যক্ষ আব্দুল মতিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জ্বল কুমার হালদার বলেন, এ ব্যাপারে আমি জানি না। খোঁজ নিয়ে অনিয়ম ধরা পড়লে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। অধ্যক্ষের নিয়মিত না আসা গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Share With