কুড়িগ্রাম জেলার সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী নিয়ে গঠিত কুড়িগ্রাম-১ সংসদীয় আসন। কৃষিনির্ভর ও চরাঞ্চলঘেরা এই জনপদে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মাঠে জমে উঠেছে উত্তাপ। পুরোনো সমস্যার সমাধান, নদীভাঙন রোধ, নিরাপত্তা এবং চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের মতো বহুদিনের দাবিকে সামনে রেখে ভোটারদের দৃষ্টি এখন বাস্তব উন্নয়নমুখী নেতৃত্বের দিকে।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ২৯ হাজার ১৬৩ জন। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬৩ হাজার ২৫৩ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৬৫ হাজার ৯০৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন তিনজন। ২৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনে প্রার্থী নিয়ে যেমন সরব রাজনৈতিক দলগুলো, তেমনি তৎপর হয়ে উঠেছেন এলাকাভিত্তিক নেতারাও।
দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির দখলে থাকা এ আসনটি পুনরুদ্ধারে এবার মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে দলটির ভেতরের গ্রুপিং, বিশেষ করে সাইফুর রহমান রানা সমর্থক এবং রানাবিরোধী গ্রুপের মধ্যে বিভাজন—বিএনপির জন্য বড় শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, এই দুই গ্রুপ একীভূত না হলে ভোট ভাগ হয়ে যাবে, যা ইসলামি দল কিংবা তৃতীয় পক্ষের জয়ের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন—দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাইফুর রহমান রানা, নাগেশ্বরী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজা, ড্যাব নেতা ডা. ইউনুছ আলী এবং ডা. মাহফুজার রহমান মারুফ। চারজনই এলাকায় সক্রিয়ভাবে গণসংযোগ করছেন।
সাইফুর রহমান রানা ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতিবার নির্বাচন করলেও জয় পাননি। এবারো তিনি মাঠে সরব। তবে দলীয় ঐক্য না থাকলে তার সামনে জয় কঠিন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জোট গঠনের গুঞ্জন নির্বাচনকে ঘিরে আরও জোরালো হচ্ছে। জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হারিছুল বারী রনি। ভোটারদের একটি বড় অংশ ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী হওয়ায় একক প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা শক্ত অবস্থানে যেতে পারে বলেই ধারণা রাজনৈতিক মহলে।
জামায়াত নেতা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “আমরা বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। কুড়িগ্রাম দীর্ঘদিন অবহেলিত। আমরা ইনসাফ ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করবো, ইনশাআল্লাহ।”
এই আসনে জাতীয় পার্টির (জাপা) বর্তমান সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ফের মনোনয়ন পেলে নির্বাচনের চিত্র অনেকটাই বদলে যেতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা। কারণ, মোস্তাফিজুর রহমান ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে লাঙ্গল প্রতীকে জয়ী হয়েছেন। ২০১৮ সালে যদিও নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আসলাম হোসেন জয়ী হন, তবে ২০২৪ সালের উপনির্বাচনে মোস্তাফিজ পুনরায় জয়ী হন।
এছাড়া জাকের পার্টির আব্দুল হাই মাস্টার এবং গণ অধিকার পরিষদের বিন ইয়ামিন মোল্লাও প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনায় রয়েছেন।
এ আসনে প্রধান সমস্যা হিসেবে উঠে আসছে—নদীভাঙন, মাদক, অনুপ্রবেশ এবং গবাদিপশু চোরাচালান। বিশেষ করে ভূরুঙ্গামারীর সীমান্তঘেঁষা ইউনিয়নগুলোতে নিরাপত্তা হুমকি এবং তরুণদের মাদকে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী গোলাম রসুল রাজা বলেন, “এখানে চরকেন্দ্রিক ইউনিয়ন বেশি। নদীভাঙন একটি স্থায়ী দুর্ভোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবাও উপেক্ষিত। আমরা দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান করবো এবং নির্বাচনে জনগণের সেবায় এগিয়ে যাবো।”
তিনি আরও বলেন, “দল থেকে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হলে আমি চরাঞ্চলের মানুষের সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।”
স্বাধীনতার পর প্রথমবার আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও পরবর্তীতে তৃতীয় সংসদ থেকে দশম সংসদ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির প্রভাব ছিল এ আসনে। আগামী নির্বাচনে বিএনপি ও ইসলামি জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে মনে করছেন অনেকেই। তবে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে ইসলামি দলগুলোর ঐক্য এবং দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন।
ভোটারদের বক্তব্য, “প্রতীকে নয়, আমরা এমন একজন জনপ্রতিনিধি চাই যিনি দুর্দিনে আমাদের পাশে থাকবেন, বাস্তব উন্নয়ন এনে দেবেন।”