পানির অপর নাম জীবন। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্বে এখনো ২.২ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ পানযোগ্য পানির অভাবে ভুগছে। মানব দেহের সকল বিপাকীয় কার্যক্রমের জন্য শরীরের ৬০-৭০% অংশ জুড়ে থাকে পানি। কৃষি, শিল্প, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে পানির ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও পানি অপরিহার্য। পৃথিবীর মোট পানির মাত্র ৩ শতাংশ হলো মিঠাপানি যার মাত্র ১.২ শতাংশ পান উপযোগী। পানির গুরুত্ব বিবেচনায় পৃথিবীতে পানি নিয়ে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ বা বিরোধও সংঘটিত হয়েছে। জর্ডান নদীর পানি সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিরিয়া-ইসরায়েল পানি সংকট (১৯৬৪-১৯৬৭), নীল নদ এর পানি নিয়ে মিশর, সুদান ও ইথিপিয়ার মধ্যে ২০১১ সাল থেকে বিরোধ, ইন্দুস নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বর্তমান, সাম্প্রতিক সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর চীনের বাঁধ নির্মাণ নিয়ে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের পানি বন্টন নিয়ে ভাটির দেশ বিশেষ করে বাংলাদেশের পরিবেশ, জীব বৈচিত্র ও অর্থনৈতিক জীবন যাত্রায় সংকটের আশংকা বিরাজমান। বাংলাদেশের পানি সংকট একটি জটিল ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা।
ব্রহ্মপুত্র নদের উৎপত্তি হয়েছে হিমালয় পর্বতমালার ৬,৬৩৮ মিটার উচ্চতায় কৈলাস শৃঙ্গের কাছে অংসি হিমবাহ থেকে। এ স্থানটি তিব্বতের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো (Yarlung Tsangpo) নদী নামে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে অরুণাচল প্রদেশ দিয়ে ভারতে শিয়াং নদী নামে প্রবেশ করেছে। পরবর্তীতে আসামে দিহাং নদী নামে বয়ে যাওয়ার সময় এতে দিবং এবং লোহিত নদী যুক্ত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নাম ধারণ করে কুড়িগ্রাম জেলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। উৎপত্তিস্থল থেকে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়া পর্যন্ত এই নদীর মোট দৈর্ঘ্য ২৯০০ কি.মি। বাংলাদেশে এটি যমুনা নামে পরিচিত এবং এক পর্যায়ে মেঘনা নদীর সাথে মিলিত হয়ে অবশেষে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।
ব্রহ্মপুত্র নদের পানির মূল উৎস হল হিমালয়ের বরফ গলা পানি (হিমবাহ) এবং বৃষ্টিপাত। ব্রহ্মপুত্রের মোট পানির প্রায় ৭০-৮০% আসে বৃষ্টিপাত থেকে, বাকি ২০-৩০% আসে হিমবাহ গলে। Tibetan Plateau Climate অনুযায়ী চীনের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৩০০-৭০০ মিমি এবং ব্রহ্মপুত্র নদের পানিতে চীনের অবদান ৩০-৩৫%। Multidisciplinary Digital Publishing Institute (Climate) অনুযায়ী ভারতীয় ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২৩০০ মি.মি এবং বাংলাদেশে ২৮৪৭ মি.মি। চীন ও ভারতের মধ্যে জলবায়ু ও অববাহিকাগত কাঠামোও এ অনুপাতের কারণ; চীনের প্লেটো অঞ্চলে বর্ষা কম বরং ভারতের পাহাড়ি ও বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরপৃষ্ঠ অঞ্চলে প্রচুর মৌসুমী বৃষ্টিপাত হয়। ব্রহ্মপুত্র নদে মোট ৫৮ টি উপনদীর পানি এসে মিলিত হয়েছে তন্মাধ্যে চীনের ২২ টি, ভারতের আসাম ও অরুণাচল প্রদেশ মিলে ৩৩ টি এবং বাংলাদেশের ৩টি উপনদী রয়েছে। (Source: Water Resource Information of India (WRIS); Journal of Hydrology and Earth System Science.)
প্রস্তাবিত চীনের তিব্বতের মালভূমিতে ইয়ারলুং জাংপো নদীতে Medog Hydro Power Station স্থাপনের মাধ্যমে পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। বাঁধের নির্মাণ কাজ ২০২৯ সালে শুরু হবে এবং ২০৩৩ সালের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। Medog তিব্বতের দক্ষিণাংশের একটি জেলা এবং Hydro Power Station টি এই জেলায় অবস্থিত। এটি এমন একটি অঞ্চল যা ভারতের অরুণাচল প্রদেশ (বিশেষত Upper Siang District) এর সীমান্ত থেকে মাত্র ৩০-৫০ কিমি দূরে এবং অংসি হিমবাহ থেকে ১৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। অংসি হিমবাহ সমুদ্র পৃষ্ট থেকে প্রায় ৬০০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং সেখান থেকে ইয়ারলুং সাংপো নদী উৎপন্ন হয়ে ৫০ কিলোমিটার দুরত্ব অতিক্রম করে হঠাৎ করে পাহাড় Namcha Barwa পর্বতের কাছাকাছি ২০০০ মিটার গভীরতায় পতিত হয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে অন্যতম গভীরতম নদী গিরিখাত এটি। প্রায় ২ হাজার মিটার উঁচু থেকে নিচে প্রবাহিত এই অংশটি পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
এখানে স্বাভাবিক সময়ে পানির স্রোতের গতিবেগ থাকে ৫ মিটার/সেকেন্ড এবং বর্ষাকালে পানির স্রোতের গতিবেগ ২০ মিটার/সেকেন্ড যা অতিমাত্রায় পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম।
চীনের মতে এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প হতে চলেছে এবং উৎপাদন ক্ষমতা হবে ৬০ গিগাওয়াট। অংসি হিমবাহ থেকে ৫০ কিলোমিটার এলাকাব্যাপী ধাপে ধাপে পাঁচটি বাঁধ নির্মাণ করা হবে। পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এই পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পটি পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এটি যুক্তরাজ্যের সারা বছরের বিদ্যুতের চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধটি হলো চীনের মধ্য অঞ্চলে অবস্থিত থ্রি গর্জেস ড্যাম যার উৎপাদন ক্ষমতা ২২.৫ গিগাওয়াট। নতুন এই বাঁধের উৎপাদন ক্ষমতা থ্রি-গর্জেস ড্যামের চেয়ে তিনগুণের বেশি।
চীনের এই পদক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রবাহ ভাটির দিকে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান ব্রহ্মপুত্র নদের অনেক ভাটিতে। ফলে এসব বাঁধ নির্মাণ হলে বাংলাদেশের প্রাণ, পরিবেশ, প্রকৃতি ও কৃষির জন্য বিপর্যয়কর এবং জীব বৈচিত্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁঝুঁকিপূর্ণ হবে। বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর পানি প্রবাহ ব্যাপকভাবে কমে যাবে। ফলে ব্রহ্মপুত্রের ওপর নির্ভরশীল নদী পাড়ের কোটি কোটি মানুষ পানি সংকটে পড়বে এবং মানুষের জীবন ও জীব বৈচিত্রে ব্যাপক ভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই প্রভাব বাংলাদেশের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে। ভাটির দেশ হিসেবে এই বাঁধ আমাদের ওপর কিরুপ প্রভাব ফেলবে তা বিভিন্ন প্রেক্ষাপট এবং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
তিন দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্রের পানির পরিমাণ:
ব্রহ্মপুত্র নদের চীনে দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭০০ কিলোমিটার, ভারতে ৯১৮ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশে (যমুনা ও মেঘনার সহ মিলিত দৈর্ঘ্য) নদীর দৈর্ঘ্য ৩৫৫ কিলোমিটার। উৎপত্তিস্থল থেকে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়া পর্যন্ত মোট দৈর্ঘ্য ২৯০০ কিলোমিটার। ব্রহ্মপুত্র নদের বার্ষিক পানি প্রবাহের পরিমাণ ১৬৫.৪ বিলিয়ন ঘনমিটার তন্মধ্যে চীনের পানি প্রবাহের পরিমাণ ১৭% বা ২৮.৯৪ বিলিয়ন ঘনমিটার, ভারতের ৫৭.৫% বা ৯৫.১০ বিলিয়ন ঘনমিটার এবং বাংলাদেশে ২৫% বা ৪১.৩৫ বিলিয়ন ঘনমিটার। অন্যভাবে একটু বিস্তৃত পরিসরে বলা যায় চীনে বর্ষাকালে ইয়ারলুং সাংপোর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭০০ কিলোমিটার, গড় প্রন্থ প্রায় ২৫০ মিটার এবং গড় গভীরতা ৬৫ মিটার হিসেবে পানির পরিমাণ বা আয়তন ২৭.৬২ বিলিয়ন ঘনমিটার। ভারতে শিয়াং/দিহাং নদের বর্ষাকালে দৈর্ঘ্য ৯১৮ কিলোমিটার, প্রস্থ ৬.৫ কিলোমিটার, এবং গভীরতা ৭০ হিসেবে পানির পরিমাণ ৪১৭.৬৯ বিলিয়ন ঘনমিটার। বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র/যমুনা নদের দৈর্ঘ্য ৩৫৫ কিলোমিটার, প্রন্থ ১০ কিলোমিটার এবং গভীরতা ৫০ মিটার হিসেবে পানির পরিমাণ ১৭৭.৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার ।শীতকালে চীনে ব্রহ্মপুত্র নদের দৈর্ঘ্য ১৭০০ কিলোমিটার, প্রস্থ ১৪০ মিটার এবং গভীরতা ১০ মিটার হলে পানির পরিমাণ ২.৩৮ বিলিয়ন ঘনমিটার, ভারতে দৈর্ঘ্য ৯১৮ কিলোমিটার, প্রস্থ ১.৬ কিলোমিটার এবং গভীরতা ১০ মিটার হলে পানির পরিমাণ ১৪.৬৮ বিলিয়ন ঘনমিটার এবং বাংলাদেশে দৈর্ঘ্য ৩৫৫ কিলোমিটার, প্রন্থ ৫.৫ কিলোমিটার এবং গভীরতা ৬ মিটার হলে পানি পরিমাণ ১১.৭১ বিলিয়ন ঘনমিটার। (Source: Journal of Regional Studies Review (JRSR) Volume 3, Issuel (২০২৪)। Pages: ১৫৬-১৬৭.
উপরোক্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা য়ায় বর্ষা ও শীতকালে বাংলাদেশ ও ভারতের অংশে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ পানি থাকে কারণ এখানে নদীর প্রন্থ এবং গভীরতা উভয়ই বেশি। চীন অংশে নদীর দৈর্ঘ্য ও গভীরতা বেশি হওয়ার পরেও নদীর প্রশ্ন কম থাকায় ভারতের চেয়ে পানির পরিমাণ কম। বাংলাদেশ অংশে নদী সবচেয়ে প্রশস্ত হওয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি থাকে। চীনের পানির পরিমাণ কম হওয়া সত্ত্বেও উৎস মুখ এবং অধিক উচ্চতা থেকে পানি পতিত হওয়ায় তা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে চীনা অংশে এই নদীর দৈর্ঘ্য ১৭০০ কিলোমিটার চীন এই দৈর্ঘ্যের পুরো এলাকায় পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
পানির গতিবেগ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন:
চীনে সমতল অঞ্চলে বর্ষাকালে পানির গতিবেগ থাকে ৫ মিটার/সে, এবং শীতকালে ২.৫ মিটার/সে; ভারতে বর্ষাকালে ২.৫ মিটার/সে, এবং শীতকালে ১.৫ মিটার/সে ও বাংলাদেশে বর্ষাকালে ২ মিটার/সে, এবং শীতকালে ১মিটার/সে.। স্রোতের গতিবেগের ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্রা নির্ভর করে। স্রোতের গতি ০.৫১ মি/সে হলে টারবাইন আন্তে ঘুরবে এবং খুব অল্প শক্তি উৎপন্ন হয়। গ্রামীণ বা ক্ষুদ্র প্রকল্পে এ ধরণের বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। স্রোতের গতি ১- ২.৫ মি/সে হলে লো-হেড টারবাইন সঞ্চালনে সক্ষম যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কার্যকর। স্রোতের গতি ২.৫৫ মি/সে হলে মাঝারি টারবাইন সঞ্চালনে সক্ষম যা শহর বা শিল্প এলাকার জন্য উপযোগী। স্রোতের গতি ৫ মি/সে এর বেশি হলে হাই-হেড টারবাইন (Pelton, Francis) এর ক্ষেত্রে কার্যকর যা বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য উপযুক্ত। চীন এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চাচ্ছে কারণ যে স্থানে পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছে সেখানে পানির স্রোতের গতি ৫ মি/সে থেকে ২০ মি/সে। (Research Gate, BWDB, River Research and Applications, China’s River System and Hydropower Projects.)
বাঁধ সম্পর্কে চীনের বক্তব্য:
চীন বলছে এটা একটি Run-of-the-river প্রজেক্ট তাই পরিবেশের কোন ক্ষতি হবে না। এই বাঁধে ভাটির দেশে পানি প্রবাহে কোন প্রভাব পড়বে না। ‘রান-অফ-দ্য-রিভার” পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি নদীর পানি প্রবাহকে সরাসরি ব্যবহার করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এখানে সাধারণত পানি ধরে রাখার জন্য বড় আকারের জলাধার থাকে না, তাই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের উপর নির্ভর করতে হয়। রান অফ দ্য রিভার” (Run-of-the-river) প্রকল্পের মাধ্যমে অনেক দেশেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। চীন, ভারত, ব্রাজিল, কানাডা, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড এবং ভেনেজুয়েলা সহ বেশ কয়েকটি দেশে এই ধরনের পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প বিদ্যমান। এখন বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন চীন যে প্রকল্প প্রণয়ন করতে যাচ্ছে তাতে তাঁরা Run-of-the-River নীতি প্রতিপালনে কতটা সক্ষম হবে, তা দেখা।
বিভিন্ন সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত:
Run-of-the-River (RoR) প্রকল্পের মাধ্যমে সারা বছর একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়। কারণ এটি নদীর প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের ওপর নির্ভর করে। এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মতামত তুলে ধরা হলো-
১. IAEA (International Energy Agency) এর মতে রান-অফ-দ্য-রিভার প্লান্টগুলোর পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা খুব কম অথবা নেই বললেই চলে এবং এগুলো নদীর প্রবাহের উপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়, যা ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনের কারণে ওঠানামা করে।
২.U.S. Department of Energy এর মতে বিদ্যুৎ উৎপাদন নদীর প্রবাহের সাথে পরিবর্তিত হয়: ফলে এটি সাধারণত বাঁধভিত্তিক জলবিদ্যুৎ ব্যবস্থার তুলনায় কম নির্ভরযোগ্য।
৩.Canada’s Hydro Québec এর মতে- রান-অফ-দ্য-রিভার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর বড় জলাধার থাকে না, ফলে এগুলো সরাসরি নদীর প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল, যা বছরের বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়।
৪. বিশ্বব্যাংক এবং International Rivers (IR) এর মতে- চীনের বাঁধগুলো নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত করে যা ভাটির দিকে ভারত ও বাংলাদেশে পানির ঘাটতি সৃষ্টি করে। ফলে চাষাবাদ ও নদীর ইকোসিস্টেম হুমকির মুখে পড়ে।
৫. পলির স্বাভাবিক গতি বন্ধ: IWMI (International Water Management Institute) এর গবেষণায় দেখা গেছে বাঁধ পলিকে আটকে রাখে, ফলে বাংলাদেশের সমতল ভূমিতে জমির উর্বরতা হ্রাস পাবে।
৬. পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের হুমকি: ড. তপন কুমার পাল (পানি সম্পদ গবেষক) বলেন চীনের বাঁধ নীতির ফলে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ছে। বিশেষ করে ইলিশ, রুই, কাতলা, মৃগেলসহ বহু জাতের মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে একের পর এক বাঁধ নির্মাণ মানে বাংলাদেশের সম্পদকে হত্যাকাণ্ডের শামিল, কারণ দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ কৃষি খাতের উপর নির্ভরশীল আর কৃষির উৎপাদন পানির প্রাপ্যতার উপর নির্ভরশীল। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল স্টেকলার বলেছেন, এই বাঁধ শুধু পানিপ্রবাহ কমাবে না, বরং এর ফলে ভাটি অঞ্চলের দিকে পলি বা কাদামাটির প্রবাহও কমে যাবে। অথচ পলিমাটি ভাটির বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি পুষ্টি উপাদান বহন করে।
পদার্থবিজ্ঞানের ভরের সংরক্ষণ সূত্র (Law of Conservation of Mass) থেকে প্রাপ্ত ধারাবাহিকতার সূত্র (Law of Contuinity) অনুসারে নদীর প্রন্থ যত কমিয়ে আনা যাবে স্রোতের বেগ তত বাড়বে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনও সেভাবেই বাড়বে। উক্ত সূত্রানুসারে নদীর প্রন্থ অর্ধেক কমালে বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্বিগুন বাড়বে। চীন যেভাবেই বিষয়টি উপস্থাপন করুক না কেন প্রকৃতপক্ষে বিদ্যুৎ উৎপাদন সমান রাখতে গেলে নদীর পানি প্রবাহে পরিবর্তন আনতে হবে। ব্রহ্মপুত্র একটি আন্তর্জাতিক নদী বিবেচনায় এই নদীর সম্পূর্ণ পানির মালিকানা চীনের একার নয় যা ইতোপূর্বেই দৈর্ঘ্য, প্রন্থ ও গভীরতার মাপকাঠিতে দেখানো হয়েছে। পানির হিস্যার পারিমাণে বাংলাদেশ ও ভারতের ন্যায্য পাওনা রয়েছে।
পরিবেশগত এবং আর্থ-সামাজিক পরিণতি:
ব্রহ্মপুত্র কেবল একটি নদ নয়, বরং এটি হাজারো প্রাণ-প্রজাতির চলমান জীবন ধারা। বালচর, জলাভূমি, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও মাছের প্রজনন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০০+ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ পাওয়া যায় মাহশীর (Mahseer) হিমালয় অঞ্চলে পাওয়া যায় সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীগুলো, গ্যাংটিক ডলফিন (Gangetic Dolphin), ঘড়িয়াল ও কুমির, জলব্যাঙ, কচ্ছপ, জলসাপ ইত্যাদি। শীতকালে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি (migratory birds) আসে নদীর চরে ও বালুচরে যেমন: সাইবেরিয়ান হাঁস, চখাচখি, পানকৌড়ি, ডুবুরি, বক চরের জঙ্গল বা আশপাশে পাওয়া যায় হাতি, চিতা বিড়াল, শিয়াল, হরিণ, বন্য শূকর ইত্যাদি। গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলবায়ুর কারণে উদ্ভিদের বৈচিত্র্য খুবই বেশি। কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে অবস্থিত এবং এখানে গণ্ডার, হাতি, বাঘ, হরিণ, জলপাখি এবং ডলফিনের অভয়ারণ্য আছে।
বাংলাদেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের প্রায় ১৫-১৮টি জেলার মানুষের জীবন-জীবিকা ব্রহ্মপুত্র নদের পানির ওপর নির্ভর করে, যার সংখ্যা আনুমানিক ৩ কোটির বেশি। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কেন্দ্রিক পেশাগুলো হলো কৃষি, মৎস্যজীবী, নৌ পরিবহণ ব্যবসা, বালু উত্তোলন ও নদী কেন্দ্রীক ব্যবসা এবং পর্যটন ও বনজ সম্পদ ইত্যাদি। বাংলাদেশের মৎস্য শিল্প দেশের জিডিপিতে ৩.৬ শতাংশ অবদান রাখে এবং অগণিত মানুষের জন্য অর্থের উৎস হয়ে ওঠে, এই পরিবর্তিত জলপ্রবাহ কেবল বিভিন্ন প্রজাতিকেই ব্যাহত করবেনা বরং নির্ভরশীল ব্যক্তিদের আর্থিক সংকট সৃষ্টি করবে এবং বন্যা, খরা, নদী ভাঙ্গন ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও ডেকে আনবে।
বৈশ্বিক পরিবেশের ওপর প্রভাব:
আলোচিত Medog Hydro Power Station টি থ্রি গর্জেস ড্যামের চেয়ে তিনগুন বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এই থ্রি গর্জেস ড্যামের পানির ভরের কারণেই পৃথিবীর অক্ষের অবস্থান সরেছে প্রায় ২ সেন্টিমিটার। পৃথিবীর দৈনিক সময় (দিন) বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ০.০৬ মাইক্রোসেকেন্ড বা ৬০ ন্যানোসেকেন্ড। (Source: NASA.) Chinese Seismological Bureau I Sichuan Geological Survey রিপোর্ট করে যে থ্রি গর্জেস বাঁধের কারণে এলাকায় ভূকম্পনের হার বেড়েছে। Geophysical Research Letters Ges Nature Geoscience এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়, “Reservoir-induced stress changes can reactivate dormant faults. ২০০৮ সালে গর্জেস ড্যামের নিকটে ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। কিছু বিজ্ঞানী ধারণা করেন এটি রিজার্ভার-প্ররোচিত ভূমিকম্প (RIS) হতে পারে। ২০০৩ সালে বাঁধ পূর্ণ হওয়ার পরবর্তী বছরেই পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছোট ভূমিকম্পের হার বেড়ে যায়। বদং অঞ্চলে ভূমিধস ঘটে গেছে ড্যামের পাশে, যেমন: Qianjiangping landslide (2003) এতে বেশ কিছু মানুষ প্রাণ হারায়। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর এত বড় বাঁধ নির্মাণের ফলে ভূমিকম্প, ভূমিধস, হঠাৎ বন্যা, পানির সংকট, পলির সরবরাহ বন্ধ, জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনসহ অনেক প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা ব্রহ্মপুত্রের মতো গতিশীল ও আন্তর্জাতিক নদীতে বড় বাঁধ নির্মাণে সতর্কতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং আন্তঃদেশীয় সমঝোতা প্রয়োজন বলে মত দেন। (Source: United Nations ESCAP & ICIMOD (2011): “The Brahmaputra Basin: Water Resources, Hazards and the Environment.)
আমাদের আশংকা:
ভারত ও চীনের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত নদী, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদী নিয়ে চলমান পানি সংঘাত বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য গভীর চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। চীনের বিস্তৃত বাঁধ নির্মাণ উদ্যোগ ভাটিতে বাংলাদেশের পানি প্রাপ্যতার জন্য সরাসরি হুমকি তৈরি করছে এবং অবশ্যম্ভাবীভাবে কৃষি উৎপাদনশীলতাকে সংকটের মুখে ফেলবে।বাংলাদেশের পানির প্রাপ্যতা প্রায় ৯০ বিলিয়ন ঘনমিটার, অথচ দেশের চাহিদা ১৪৭ বিলিয়ন ঘনমিটার। অর্থাৎ প্রায় ৪০% পানির ঘাটতি রয়েছে, যা বিশেষভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলে খরার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। আবার বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে দেশের ৮০% এলাকা প্লাবিত হয়, ফসল, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন অবকাঠামো বিনষ্ট হয় যা জিডিপির’র ১.৫% এবং প্রতি বছর গড়ে ৪.৭ মিলিয়ন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বাংলাদেশের মোট পানি সম্পদের ৬৭% সরবরাহ করে ব্রহ্মপুত্র, ১৮% পদ্মা/গঙ্গা এবং ১৫% আসে মেঘনা নদী থেকে। (Source: The Journal of Regional Studz Review, Page: ১৬২/২০২৪).
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞগণ অভিমত পোষণ করেন যে, চীন ও ভারতের কর্মকাণ্ডের ধারা দেখে মনে হচ্ছে, সেই দিন খুব দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ এক কিউবিক মিটার পানিও পাবে না। কারণ, উভয় দেশ ভারত ও চীন মেঘনা, ইয়াংসী, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ-নদীর উপর প্রায় ২০০টি বড় ও ছোট বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে, যা একটি গুরুতর ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে চরম পানি সংকটে পড়তে পারে। কারণ যত বেশি বাঁধ তৈরি হবে, তত বেশি পানি সেসব বাঁধে সংরক্ষিত থাকবে এবং নিম্নপ্রবাহে খুব সামান্য পরিমাণ পানি পৌঁছাতে পারবে।
বাংলাদেশ যেহেতু চীন ও ভারতের ভাটির একটি দেশ, তাই পানি সম্পদ নিয়ে ভারত ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে আটকা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত প্রভাবের পাশাপাশি বিস্তৃত ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আঃসীমান্ত নদীর সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে আরো জটিল করে তুলবে। আর এই জটিলতা বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক, রাজনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত বাধার একটি জটিল জাল তৈরি করবে যা আমাদের পানি প্রাপ্যতাকে আরো অনিশ্চিত করে তুলবে।
পানি সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের কৌশল:
ভবিষ্যতে যে কোনো পানিযুদ্ধ এড়িয়ে চলতে ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রবাহের বিষয়ে চীন, ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দক্ষিণ এশীয় পানি উদ্যোগ (SAWI) এর মতো আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলি তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং নীতিগত সংলাপও প্রদান করতে পারে। এছাড়াও, বিশ্বব্যাংক এবং এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলিকে বাংলাদেশের মধ্যে টেকসই উন্নয়নমূলক প্রকল্প পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করতে পারে। জনসচেতনতা এবং সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত করা টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা প্রচেষ্টায় সাফল্যে বয়ে আনবে।
লেখক:
প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন।
অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।