মাদকের বিষাক্ত থাবা: আপনজন হত্যা, সীমাবদ্ধতা ও সমাধানের পথ

দারিদ্র্যের অন্ধকার গলি আর মাদকের মরণ ছোবল—এই দুয়ের মাঝে পিষ্ট হয়ে আজ রক্তে ভিজছে দেশের অধিকাংশ এলাকা। যেখানে কোন পরিবারের জন্য  দুমুঠো ভাতের লড়াই প্রতিদিনের বাস্তবতা, সেখানে বিষাক্ত মাদকের নেশা যুবসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে এক অন্ধকারের অতল গহ্বরে। মাদকের টাকার জন্য সন্তান হারাচ্ছে তার বিবেক, আর মা হারাচ্ছেন তার সন্তানকে। সামান্য টাকার জন্য কিংবা মাদকের ক্ষমতার আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ; প্রতিনিয়ত বাড়ছে লাশের মিছিল। দেশের প্রতিটি জনপদের বাতাস আজ স্বজনহারা মানুষের কান্না আর আতঙ্কে ভারী হয়ে উঠেছে। দারিদ্র্যের সুযোগ কিংবা বিত্তবানদের অপরিণামদর্শিতার সুযোগ নিয়ে মাদকের এই সর্বনাশা থাবা যেভাবে একের পর এক খুন আর নৃশংসতা ডেকে আনছে, তা কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবক্ষয় নয়—একটি পুরো সমাজের বেঁচে থাকার স্বপ্নকে নির্মমভাবে হত্যা করছে। সারা দেশের মাদকের ভয়াবহতার চিত্র একই হলেও সুনির্দিষ্টভাবে পিছিয়ে পড়া জেলা কুড়িগ্রামের বাস্তব চিত্রের আলোকে মাদকের ভয়াবহতা, নৃশংসতা ও অবক্ষয় তুলে ধরা হলো।

আপনজনদের রক্তে রঞ্জিত রক্তের সম্পর্ক

কুড়িগ্রামে মাদকাসক্তদের হাতে নিজের পরিবারের সদস্য ও আপনজনদের খুনের তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে:

১৩ নভেম্বর ২০১৫: ফুলবাড়ী উপজেলার হাসপাতাল মোড় এলাকায় মাদকাসক্ত ছেলের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন বাবা আবুল কাশেম সরদার।

২০ মার্চ ২০২০: রাজারহাট উপজেলার উমর মজিদ ইউনিয়নের পান্থাবাড়ী গ্রামে জুম্মার নামাজ পড়া অবস্থায় আপন মাকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে মানসিক ভারসাম্যহীন এক মাদকাসক্ত যুবক।

১৪ অক্টোবর ২০২৬: কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের পলাশবাড়ী এলাকায় মাদকাসক্ত ছেলের নৃশংস ছুরিকাঘাতের শিকার হন মা-বাবা। মা পারুল বেগম ঘটনা স্থলে নিহত হন।

১৯ অক্টোবর ২০২৬: উলিপুর উপজেলার ধরণীবাড়ী ইউনিয়নের পণ্ডিতপাড়া গ্রামে বড় ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে নাতির ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হন দাদা বাচ্চু মিয়া।

২৩ অক্টোবর ২০২৬: রৌমারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের বারবান্দা গ্রামে মাদকাসক্ত ভাতিজার শাবলের আঘাতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান আপন চাচি সোনা বানু (৪৫)।

আইনি জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রী বিচার

কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পূর্ববর্তী এক বছরে জেলার সবকটি থানা মিলিয়ে মোট ৬৭৮টি মাদক মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এসব মামলায় ৮৫০ জন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার এবং প্রায় ৩২ কোটি টাকার মাদক উদ্ধার করা হয়। তবে মামলা হলেও বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে অপরাধীরা সঠিক সময়ে শাস্তি পায় না। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে কুড়িগ্রামের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত ১৭ বছর আগের একটি মাদক মামলায় ১ আসামিকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা করেন।

বর্তমানে দেশের নিম্ন ও উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মোট ফৌজদারি মামলার প্রায় ২২ শতাংশই মাদকসংক্রান্ত, যার সংখ্যা ৪ লাখেরও বেশি। তবে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন সময়ের রায় পর্যালোচনা করে দেখা গেছে মাদক মামলার প্রায় ৫২% থেকে ৫৯% আসামিই তথ্যপ্রমাণ বা আইনি ফাঁকফোকরের কারণে আদালত থেকে খালাস পেয়ে যান।

চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের চরম সংকট

দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮০ থেকে ৮৩ লাখের বেশি মাদকাসক্ত ব্যক্তি থাকলেও সরকারি ও নিবন্ধিত বেসরকারি মিলিয়ে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের মোট শয্যা সংখ্যা ৩ থেকে ৪ হাজারেরও কম। ফলে শতকরা ৯৮ ভাগের বেশি আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো ধরনের চিকিৎসা সেবার আওতায় আসতে পারেন না। আবার চিকিৎসা শেষে উপযুক্ত পারিবারিক ও সামাজিক পুনর্বাসন না হওয়ার কারণে প্রায় ৫০% থেকে ৬০% রোগী পুনরায় মাদকের জগতে ফিরে যান।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে মাদক নিয়ন্ত্রণে দুটি মডেল

পর্তুগাল মডেল: 

মাদক নিয়ন্ত্রণে কেবল কঠোর শাস্তির চেয়ে পুনর্বাসনভিত্তিক নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি যে বেশি ফলপ্রসূ, তার বড় উদাহরণ পর্তুগাল। পর্তুগাল মাদক কেনাবেচা বা চোরাচালানকে অবৈধ রাখলেও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ মাদক রাখাকে অপরাধমুক্ত (Decriminalize) করেছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ গ্রেপ্তার না করে অভিযুক্তকে আইনজীবী, মনোবিজ্ঞানী ও সমাজকর্মীদের একটি বিশেষ প্যানেলে পাঠায়, যারা শাস্তির বদলে চিকিৎসার পরামর্শ দেয়। সরকার লোক দেখানো প্রচারণার অর্থ বাঁচিয়ে চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও আসক্তদের কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ করায় পর্তুগালে মাদকজনিত মৃত্যু, অপরাধ ও কয়েদির সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমেছে।

অন্যদিকে, আমেরিকা (যেমন ওরেগন) ও কানাডার (যেমন ব্রিটিশ কলাম্বিয়া) কিছু অঞ্চলে এই মডেল অনুসরণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ পর্তুগাল পুরো দেশজুড়ে স্বরাষ্ট্র, বিচার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে এটি বাস্তবায়ন করেছিল; পক্ষান্তরে আমেরিকা-কানাডায় তা কেবল নির্দিষ্ট কিছু রাজ্যে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করায় আশপাশের অঞ্চল থেকে আসক্তরা ভিড় জমায়, যা স্থানীয় ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

সিঙ্গাপুর মডেল: 

মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘সিঙ্গাপুর মডেল’ বিশ্বজুড়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। স্বাধীনতার পর প্রকট মাদক সংকট মোকাবেলায় দেশটি ১৯৭৩ সালে ‘মিসইউজ অব ড্রাগস অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে, যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ মাদক (যেমন: ১৫ গ্রাম হেরোইন বা ৫০০ গ্রাম গাঁজা) বহন বা পাচারের জন্য বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ড, দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও বেত্রাঘাতের মতো আপসহীন শাস্তির বিধান রাখা হয়; আর এই কঠোর আইন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং অকাট্য বিচার ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রয়োগই সিঙ্গাপুরকে বিশ্বের অন্যতম মাদকমুক্ত ও নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। ১৯৭৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে ৪০০ থেকে ৫০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে কেবল মাদকসংক্রান্ত অপরাধে। ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে মোট ৬১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৮ জনই মাদক মামলার অপরাধী।

পারিবারিক সচেতনতা ও প্রথম পাঠশালা

মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে পিতা-মাতার খুন হওয়ার হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আমাদের পারিবারিক বন্ধন ও মূল্যবোধ কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। এর সমাধান কেবল আইন বা শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মাদক নির্মূলে সবার আগে প্রয়োজন ‘পরিবার নামক প্রথম পাঠশালা’র পুনর্জাগরণ।

পিতা-মাতাকে কেবল শাসনকর্তা না হয়ে সন্তানের বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু হতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে এবং তার মনের গোপন কষ্ট বা হতাশা কী—তা বোঝার জন্য নজরদারি নয়, বরং গভীর আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র বা প্রশাসন তখনই সফল হবে, যখন প্রতিটি পরিবার তার সন্তানের মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষার প্রথম প্রাচীর হয়ে উঠবে। পরিবারের অনাবিল ভালোবাসাই পারে একটি থমকে যাওয়া জীবনকে আবার আলোর পথে ফেরাতে।

লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।

Share With

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *