জ্বালানি নিয়ে পিঠ যখন দেয়ালে : সংকটই তখন সমাধানের পথ— প্রফেসর মীর্জা মো. নাসির উদ্দিন

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি তেলের সংকটের বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে দেশের সকল খাতে। এ ধরণের সংকট সৃষ্টির কারণ মানবসভ্যতার শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী অন্তর্দ্বন্দ্ব, সংঘাত যেন লেগেই আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ১ লাখ ২৫ টন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় তবে  প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণক্ষেত্রে এই অস্ত্রগুলোর ব্যাপক ব্যবহার হয়নি। নাৎসি জার্মানি তাদের গ্যাস চেম্বারে ‘জাইক্লন বি’  নামক বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধে রাসায়নিক ব্যবহারের  পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৬ হাজার টন। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ৬০০টিরও বেশি কুয়েতি তেলকূপ ইচ্ছাকৃতভাবে পুড়িয়ে ফেলা হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি/২০২৬ সালে শুরু হওয়া আমেরিকা ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের ওপর চলমান হামলা এবং আত্মরক্ষার্থে ইরানের পাল্টা হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলে যে নারকীয় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে তাতে দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা রয়ে গেছে। এ সংঘাতে গোটা বিশ্ব আজ হুমকির সম্মুখীন।

সংকট কেবল মানুষের নয়, বরং প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীকেই প্রতিকূলতা জয় করে টিকে থাকতে হয়। যেকোনো সংকট উত্তরণে প্রয়োজন গভীর গবেষণা, পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিশ্লেষণ, অতীতের দৃষ্টান্ত এবং কার্যকর বিকল্প পন্থা উদ্ভাবন। বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আমরা কীভাবে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারি এবং টিকে থাকতে পারি, তা নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলোকপাত করছি।

প্রাণিজগৎ ও মানবদেহের টিকে থাকার কৌশল: 

মরুভূমির জাহাজ উট প্রচন্ড গরমে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় ৫ থেকে ৭ দিন পানি ছাড়া টিকে থাকতে পারে। এমনকি কুঁজে সঞ্চিত চর্বি ব্যবহার করে এটি প্রায় ৬ মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকে। শরৎকালে কাঠবিড়ালিরা ভবিষ্যতের জন্য হাজার হাজার বাদাম লুকিয়ে রাখে এবং উন্নত ‘স্পেশিয়াল মেমরি’ ব্যবহার করে সংকটের সময় সেগুলো নিখুঁতভাবে খুঁজে বের করে। মরুভূমির হানি পট পিঁপড়েরা খাদ্যাভাব মেটাতে নিজেদের শরীরকেই ‘জীবন্ত গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করে। দলের কিছু পিঁপড়ে অতিরিক্ত মধু খেয়ে পেট ফুলিয়ে চাকের ছাদে ঝুলে থাকে এবং সংকটের সময় তারাই অন্য পিঁপড়েদের মুখ দিয়ে খাবার সরবরাহ করে টিকে থাকতে সাহায্য করে। গ্রেট গ্রে শ্রাইক তার ফড়িং, টিকটিকি,ইদুর ইত্যাদি শিকারকে কাঁটা বা কাঁটাতারে গেঁথে রাখে, যা পাখির জগতে ‘কসাইখানা’ নামে পরিচিত। মূলত শিকারের বিষক্রিয়া নষ্ট করতে এবং সংকটের সময় নিরাপদ খাবারের মজুত নিশ্চিত করতেই তারা এই অদ্ভুত কৌশল কাজে লাগায়। ক্লার্কের নাটক্র্যাকার পাখি খাদ্য সংকট মোকাবিলার জন্য প্রায় ৩০,০০০ এর বেশি পাইন বীজ শত শত বর্গমাইল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লুকিয়ে রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯ মাস পরেও তারা প্রায় ৮০% বীজ সঠিক জায়গা থেকে খুঁজে বের করতে পারে। তবে বিস্ময়কর হলো টারডিগ্রেড নামক অণুবীক্ষণিক প্রাণীটি; প্রতিকূল পরিবেশে বিপাকীয় হার প্রায় শূন্যে নামিয়ে এরা খাবার বা পানি ছাড়াই ৩০ বছর বাঁচতে পারে। এই বৈচিত্র্যময় পদ্ধতিগুলো প্রমাণ করে যে, খাদ্য সহ যে কোন সংকট নিরসনে প্রাণীকুল কতটা দক্ষ হতে পারে।

মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ক চরম প্রতিকূলতায় টিকে থাকার জন্য অসাধারণ কিছু জৈবিক ও মানসিক কৌশল অবলম্বন করে। খাবার না পেলে শরীর তার মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া কমিয়ে দেয়। এর ফলে সঞ্চিত ক্যালরি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করা সম্ভব হয়। কিটোসিস প্রক্রিয়ায় খাবারের শর্করা শেষ হয়ে গেলে শরীর জমানো চর্বি পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদন শুরু করে। চর্বি শেষ হয়ে গেলে শরীর তার পেশির প্রোটিন ভাঙতে শুরু করে। বিশেষ প্রয়োজনে জীবন বাঁচার তাগিদে শরীর তখন হাত বা পায়ের মতো কম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দিয়ে কেবল মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড এবং ফুসফুসকে সচল রাখার চেষ্টা করে। মানুষ তখন অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া বন্ধ করে দেয়। কথা বলা বা হাঁটাচলা কমিয়ে দিয়ে কেবল বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু শক্তি খরচ করে। চরম সংকটে মানুষ আদিম অভ্যাসে ফিরে যায়। যেমন- বৃষ্টির জল ধরা, শিশির সংগ্রহ করা বা মাটির নিচে থাকা আর্দ্রতা ব্যবহার করা। খাবার না থাকলে অনেক সময় বন্য ফলমূল বা নির্দিষ্ট ধরণের ঘাস খেয়েও মানুষ দিনাতিপাত করে। সংকট মোকাবিলায় মানবদেহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। পানিশূন্যতায় হরমোনের নির্দেশে কিডনি প্রসাবের পরিমাণ কমিয়ে দেয় এবং রক্তে পানি ফিরিয়ে আনে এবং দূর্ঘটনায় রক্তক্ষরণ হলে লিভার তার সঞ্চিত রক্ত  মূল প্রবাহে পাঠিয়ে হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্ককে সচল রাখে। কোন মানুষ হঠাৎ কোনো বিপদের মুখে পড়লে তার হার্ট “Fight or Flight” মোডে চলে যায়। হৃদপিণ্ড ত্বক বা পেটের মতো কম প্রয়োজনীয় জায়গা থেকে রক্ত সরিয়ে সরাসরি মস্তিষ্ক ও পেশিতে পাঠিয়ে দেয়। এতে মানুষ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে এবং শরীরকে বিপদমুক্ত করতে পারে।

জ্বালানি সংকটে বিভিন্ন জাতির অভিনব ও সাহসী টিকে থাকার কৌশল

১. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ‘উড গ্যাস’ (Wood Gas) চালিত গাড়ি

উড গ্যাস চালিত গাড়ি বা কাঠের গ্যাসে চলা গাড়ি মূলত যুদ্ধের সময়কার এক অভাবনীয় উদ্ভাবন। এই গাড়িতে পেট্রোলের বদলে কাঠ বা কয়লা পোড়ানো গ্যাস জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গাড়ির পেছনে বা পাশে একটি বড় সিলিন্ডার থাকে যাকে ‘গ্যাসিফায়ার’ বলে। সিলিন্ডারের ভেতর কাঠকে নিয়ন্ত্রিতভাবে (অক্সিজেন কমিয়ে) উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়। এতে কাঠ সরাসরি ছাই না হয়ে কার্বন মনোক্সাইড এবং হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করে। উড গ্যাস চালিত গাড়ি বা কাঠের গ্যাসে চলা গাড়ি মূলত যুদ্ধের সময়কার এক অভাবনীয় উদ্ভাবন। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় পেট্রোলের তীব্র সংকট দেখা দিলে ইউরোপ ও এশিয়ায় প্রায় ১০ লক্ষের বেশি গাড়ি উড গ্যাসে চালানো হতো। বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে যেখানে জ্বালানি সংকট প্রবল, সেখানে এখনও অনেক মালবাহী ট্রাক এই পদ্ধতিতে চালানো হয়। বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে যেখানে জ্বালানি সংকট প্রবল, সেখানে এখনও অনেক মালবাহী ট্রাক এই পদ্ধতিতে চালানো হয়। এভাবেই উত্তর কোরিয়া তার জ্বালানি সংকটের সময় বিভিন্ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে টিকে থাকে।জার্মানি, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া এবং সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে সরাসরি গাড়ি চালানোর চেয়ে জৈব-গ্যাসিফিকেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ এবং ঘর গরম রাখার (District Heating) কাজ করা হয়। ফিনল্যান্ডে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু শৌখিন মানুষ এখনও তাদের গাড়িকে উড গ্যাসে রূপান্তর করে চালাচ্ছেন। আমেরিকা এবং সুইডেনে অনেক ইঞ্জিনিয়ার এবং পরিবেশবাদী গোষ্ঠী পেট্রোলের বিকল্প হিসেবে নিজেদের গাড়ি বা ট্রাক্টরকে উড গ্যাস সিস্টেমে রূপান্তর করে ব্যবহার করেন। 

২. কিউবার ‘সাইকেল 

কিউবার সাইকেল বিপ্লব আধুনিক ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং তার ফলে সৃষ্ট চরম অর্থনৈতিক সংকটের  প্রেক্ষাপটে এই বিপ্লব ঘটেছিল।সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবায় ভতুর্কি মূল্যে জ্বালানি তেল আসা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দেশটির গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে এবং বাস বা কার চালানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে কিউবা চাইলেই অন্য দেশ থেকে সহজে তেল বা গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করতে পারছিল না।গণপরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সাধারণ মানুষের কাজে যাওয়ার জন্য বিকল্প কোনো সাশ্রয়ী যাতায়াত মাধ্যমের প্রয়োজন দেখা দেয়।  ফিদেল কাস্ত্রোর সরকার চীন থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ ‘ফ্লাইং পিজিয়ন’ (Flying Pigeon) ব্র্যান্ডের সাইকেল আমদানি করে এবং অত্যন্ত কম মূল্যে বা কিস্তিতে শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করে।সাইকেলের ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে দেশজুড়ে হাজার হাজার ‘পনচেরা’ (Ponchera) বা সাইকেল মেরামতের দোকান গড়ে ওঠে। এটি সাধারণ মানুষের জন্য আয়ের একটি নতুন উৎস হয়ে দাঁড়ায়।জ্বালানি সাশ্রয় হওয়ায় কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। পাশাপাশি নিয়মিত সাইকেল চালানোর ফলে কিউবানদের মধ্যে স্থুলতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।সাইকেল বিপ্লব সমাজের শ্রেণিভেদ কমিয়ে দিয়েছিল। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমিক—সবাই একই ধরনের সাইকেলে চড়ে যাতায়াত করতেন, যা কিউবার সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে এক নতুন রূপ দিয়েছিল।

৩. নেদারল্যান্ডসের সাইকেল বিপ্লব: একটি টেকসই রূপান্তরের ইতিহাস

১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে ডাচ শহরগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ির আধিপত্য বাড়তে শুরু করলে তীব্র যানজট তৈরি হয়। তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয় ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে। ১৯৭২ সালে নেদারল্যান্ডসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যান, যার মধ্যে ৪৫০ জনই ছিল শিশু। এর প্রতিবাদে দেশজুড়ে “Stop de Kindermoord” (শিশু হত্যা বন্ধ করো) নামক এক শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। ঠিক এই সময়েই ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের কারণে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হলে ডাচ সরকার ‘কার-মুক্ত রবিবার’ পালন শুরু করে। এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষকে পুনরায় সাইকেলের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। জনগণের দাবি ও সরকারের সঠিক পরিকল্পনায় শহরগুলোতে গড়ে তোলা হয় সাইকেলের জন্য আলাদা ও সুরক্ষিত লেন। বর্তমানে দেশটিতে ৩৫,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি ডেডিকেটেড সাইকেল পথ রয়েছে।

নেদারল্যান্ডস বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে মানুষের চেয়ে সাইকেলের সংখ্যা বেশি। প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যার এই দেশে সাইকেল আছে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ। এখানে সাইকেল চালানো কেবল শখ বা ব্যায়াম নয়, বরং প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী—সবার জন্যই এটি যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। বিশেষ করে ট্রেন স্টেশনে বিশাল সাইকেল পার্কিং সুবিধা এবং ট্রেনে সাইকেল বহনের সুযোগ থাকায় ডাচরা ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়াই এক শহর থেকে অন্য শহরে অনায়াসেই যাতায়াত করতে পারে। নেদারল্যান্ডের  উট্রেখট শহরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাইকেল পার্কিং গ্যারেজ রয়েছে, যেখানে প্রায় ১২,৫০০ সাইকেল রাখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, সাইকেল ব্যবহারের কারণে ডাচ অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ইউরো সাশ্রয় হয় এবং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পায়।

৪. জাপানের ‘কুল বিজি’ প্রচারণা

জাপানের অফিসগুলোতে সাধারণত গরমকালেও কর্মীরা স্যুট, টাই এবং ফর্মাল জ্যাকেট পরে কাজ করতেন। এই পোশাক পরে গরম সহ্য করা কঠিন ছিল বলে অফিসগুলোতে এসি (Air Conditioning) খুব বেশি মাত্রায় চালানো হতো। ‘কুল বিজি’ হলো এমন এক প্রচারণা যার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি অফিসের কর্মীদের গরমের সময় টাই ও জ্যাকেট ছাড়াই হালকা পোশাকে (যেমন: হাফ হাতা শার্ট বা পোলো শার্ট) অফিসে আসার অনুমতি দেওয়া হয়।

 অফিসগুলোতে এসির তাপমাত্রা বাড়িয়ে ২৮° সেলসিয়াস বা তার উপরে রেখে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো হয়।

 এই উদ্যোগের ফলে প্রথম বছরেই প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব হয়েছিল, যা প্রায় ১০ লাখ বাড়ির বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমান। জাপানিদের কঠোর ‘ড্রেস কোড’ বা পোশাকী রীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। হালকা ও আরামদায়ক ‘কুল বিজি’ ফ্যাশন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যা পরে পোশাক শিল্পের বাজারেও নতুন গতি আনে।জাপানের এই সাফল্য দেখে দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশ তাদের সরকারি অফিসগুলোতে অনুরূপ ‘ড্রেস কোড’ শিথিল করার নীতি গ্রহণ করে।কুল বিজির সাফল্যের পর শীতকালেও হিটারের ব্যবহার কমাতে এবং ভারি পশমি কাপড় পরতে উৎসাহিত করতে জাপান সরকার ‘ওয়ার্ম বিজি’ (Warm Biz) শুরু করে।

৫. আইসল্যান্ডের ‘জিওথার্মাল’ রূপান্তর 

বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও আইসল্যান্ড ছিল ইউরোপের অন্যতম দরিদ্র দেশ, যারা মূলত মাছ ধরা এবং কয়লা বা তেলের আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল।, ১৯৭৩ সালের বিশ্বব্যাপী তেল সংকট আইসল্যান্ডকে বড় ধাক্কা দেয়। আমদানিকৃত তেলের আকাশচুম্বী দামের কারণে দেশটি তাদের নিজস্ব শক্তির উৎস খোঁজা বাধ্যতামূলক বলে মনে করে। আইসল্যান্ড একটি আগ্নেয়গিরি-প্রবণ দ্বীপ দেশ। টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার মাটির খুব কাছেই ফুটন্ত জল ও বাষ্পের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। আইসল্যান্ড এই ভূ-তাপীয় শক্তি (Geothermal Energy) ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমানে আইসল্যান্ডের প্রায় ১০০% বিদ্যুৎই আসে নবায়নযোগ্য উৎস (জিওথার্মাল ও হাইড্রো-ইলেকট্রিক) থেকে। এটি বিশ্বের খুব কম দেশের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। জিওথার্মাল শক্তি ব্যবহার করে আইসল্যান্ডের তীব্র শীতেও গ্রিনহাউসে টমেটো, শসা এবং এমনকি কলা পর্যন্ত চাষ করা সম্ভব হচ্ছে, যা দেশটির খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।জিওথার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে নির্গত খনিজ সমৃদ্ধ গরম পানি দিয়ে তৈরি হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত Blue Lagoon এর মতো স্পা সেন্টার, যা দেশটির পর্যটন খাতের প্রধান আকর্ষণ। আইসল্যান্ড বর্তমানে জিওথার্মাল শক্তি ব্যবহার করে বাতাস থেকে সরাসরি কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে তাকে পাথরে রূপান্তরিত করার প্রযুক্তিতে বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আইসল্যান্ড প্রমাণ করেছে যে, প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশকেও সঠিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের মাধ্যমে আশীর্বাদে পরিণত করা সম্ভব। এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বড় উদাহরণ যে কীভাবে আমদানিকৃত জ্বালানির বদলে স্থানীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।

৬. উত্তর কোরিয়ার ‘ব্যাগি’ বাস 

উত্তর কোরিয়ার ‘ব্যাগি বাস’  এবং মিথেন গ্যাসের ব্যবহার মূলত দেশটির চরম জ্বালানি সংকটের মুখে টিকে থাকার এক কার্যকর দেশীয় কৌশলের উদাহরণ। ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের  পর যখন তেলের সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের যাতায়াত সচল রাখতে এই উদ্ভাবনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।উত্তর কোরিয়ার রাস্তায় এমন অনেক বাস দেখা যেত যার ছাদে বিশাল আকারের একটি বেলুন বা ব্যাগের মতো বস্তু বসানো থাকত। একেই মূলত ‘ব্যাগি বাস’ বলা হয়। এই বাসগুলো মূলত মিথেন গ্যাস বা কয়লা থেকে উৎপাদিত গ্যাসে চলে। বাসের ছাদে থাকা বিশাল ব্যাগে এই গ্যাস নিম্ন চাপে সঞ্চিত রাখা হয়। গ্যাস শেষ হয়ে গেলে ব্যাগটি চুপসে যায়, যা দেখে বোঝা যায় যে আবার গ্যাস ভরার সময় হয়েছে।জ্বালানি তেলের বিকল্প হিসেবে উত্তর কোরিয়া মিথেন গ্যাস উৎপাদনে ব্যাপক জোর দেয়, যা তারা মূলত পশুপাখির মলমূত্র এবং পচনশীল আবর্জনা থেকে সংগ্রহ করে। বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার বড় শহরগুলোতে (যেমন পিয়ং ইয়ং) চীন থেকে আসা আধুনিক বাস এবং ইলেকট্রিক ট্রলি বাসের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে এই ‘ব্যাগি বাস’গুলো এখন মূলত প্রান্তিক শহর বা গ্রামীণ এলাকাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

৭. ব্রাজিলের ‘ইথানল’ বিপ্লব

১৯৭৩ সালের তেল সংকটের সময় ব্রাজিল তাদের ব্যবহৃত তেলের ৮০% আমদানি করত। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশটির অর্থনীতি ধসে পড়ার উপক্রম হয়। ব্রাজিলের জলবায়ু আখ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। দেশটি আগে থেকেই বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ আখ উৎপাদনকারী ছিল। সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি আখ থেকে ইথানল তৈরি করে তা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে।ব্রাজিলের এই বিপ্লবের আসল মোড় ঘোরে ২০০৩ সালে, যখন তারা ‘ফ্লেক্স-ফুয়েল’ ইঞ্জিন চালিত গাড়ি বাজারে আনে। ব্রাজিলের এই মডেলটি বর্তমানে ভারতসহ অনেক দেশ অনুসরণ করছে। ভারতের বর্তমান ‘ইথানল ব্লেন্ডিং প্রোগ্রাম’ মূলত ব্রাজিলের এই সফল অভিজ্ঞতা থেকেই অনুপ্রাণিত।

এই ইতিহাসগুলো আমাদের শেখায় যে, যখন পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন মানুষ কেবল সীমাবদ্ধতার কথা ভাবে না, বরং হাতের কাছে থাকা অতি সাধারণ সম্পদ (যেমন কাঠ, কৃষি বর্জ্য বা মাটির নিচের তাপ) দিয়েই বড় বড় সমস্যার সমাধান করে ফেলে।

৮. ফ্রান্সে ‘গ্যাসোজেন’ প্রযুক্তির বিবর্তন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সে পেট্রোল প্রায় দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছিল। তখন তারা কেবল কাঠ নয়, বরং কয়লা, কাঠকয়লা এবং এমনকি পশুপালনের উচ্ছিষ্ট ব্যবহার করে ইঞ্জিন চালাত। ফরাসিরা এই প্রযুক্তিকে এতই উন্নত করেছিল যে, তখনকার সময়ে বিখ্যাত সাইট্রোয়েন (Citroën) গাড়িগুলোর ডিজাইন পরিবর্তন করে সেগুলোতে বিশাল সিলিন্ডার বা চুল্লি স্থায়ীভাবে যুক্ত করা হয়েছিল। এটি আধুনিক হাইব্রিড গাড়ির একটি আদি এবং রুক্ষ সংস্করণ বলা যেতে পারে।

৯. গ্রিসের ‘লিগনাইট’ বিপ্লব

১৯৪০-এর দশকে যুদ্ধের প্রভাবে গ্রিস যখন কয়লা আমদানির পথ হারায়, তখন তারা তাদের নিজেদের মাটির নিচে থাকা নিম্নমানের লিগনাইট বা ‘বাদামী কয়লা’ উত্তোলনে বাধ্য হয়।সাধারণ ফার্নেস বা চুল্লি এই লিগনাইট পোড়ানোর উপযুক্ত ছিল না। গ্রিক ইঞ্জিনিয়াররা রাতারাতি ছোট ছোট কারখানায় চুল্লির গঠন পরিবর্তন করে ফেলেন যাতে এই নিম্নমানের কয়লা দিয়েও বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদন করা যায়। এটি একটি জাতির স্বনির্ভর হওয়ার বাস্তব উদাহরণ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টেকসই ও উদ্ভাবনী জ্বালানি রূপান্তরের সম্ভাবনা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশও তার সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও একটি টেকসই সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান, জনঘনত্ব এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি বিবেচনায় নিচের ক্ষেত্রগুলো অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হতে পারে:

১. জ্যাট্রোফা (ভ্যারেন্ডা) থেকে বায়ো-ডিজেল: জ্বালানি তেলের শক্তিশালী বিকল্প হতে পারে জ্যাট্রোফা বা ভ্যারেন্ডা গাছ। এটি চাষের জন্য উর্বর জমির প্রয়োজন হয় না; রাস্তার পাশে, রেললাইনের ধারে বা পতিত জমিতে অনায়াসেই এটি জন্মে। এই গাছের বীজ থেকে উৎপাদিত বায়ো-ডিজেল সরাসরি অথবা সাধারণ ডিজেলের সাথে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে সেচ পাম্প ও ট্রাক্টরের ইঞ্জিনে ব্যবহার করা সম্ভব। এটি আমাদের জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।

২. কৃষি বর্জ্য ও ধানের তুষ থেকে বিদ্যুৎ: উত্তরবঙ্গসহ বাংলাদেশের ধান উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে প্রচুর পরিমাণে তুষ উৎপাদিত হয়। কিউবা বা ব্রাজিলের মতো আমরাও এই কৃষি বর্জ্যকে জ্বালানিতে রূপান্তর করতে পারি। ধানের তুষ ব্যবহার করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের বায়োমাস পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় সেচ কাজের ও ক্ষুদ্র শিল্পের বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব।

৩. রেলপথের আধুনিকায়ন ও প্রসার: সড়কপথের চেয়ে রেলপথ অনেক বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। দেশের উত্তরবঙ্গসহ অন্যান্য প্রান্তিক অঞ্চলের সাথে রেল যোগাযোগ আরও উন্নত, সুসংগত ও দ্বিমুখী (Double line) করলে পণ্য পরিবহনে জ্বালানি খরচ ও সময়—উভয়ই বহুগুণ কমে যাবে। এটি জাতীয় অর্থনীতিতে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

৪. ই-বাইক ও ইজি বাইকের সোলার রূপান্তর: বাংলাদেশে ইজি বাইক এখন যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তবে এগুলোর ব্যাটারি চার্জিংয়ের জন্য বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়। যদি প্রতিটি অঞ্চলে সোলার চার্জিং স্টেশন ব্যবহার করা যায়, তবে মূল গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং দিনের বেলার অতিরিক্ত সূর্যরশ্মিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

৫. বর্জ্য তাপ পুনরুদ্ধার (Waste Heat Recovery) প্রযুক্তি: বাংলাদেশের অনেক শিল্পকারখানায় বয়লার বা জেনারেটর থেকে প্রচুর তাপ বাতাসে হারিয়ে যায়। জাপানের মতো আমরাও যদি ‘ওয়েস্ট হিট রিকভারি’ প্রযুক্তি ব্যবহার করি, তবে সেই পরিত্যক্ত তাপ দিয়ে পুনরায় পানি গরম করা বা বাষ্প তৈরি করে জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব। এটি শিল্প খাতের দক্ষতা অনেক বাড়িয়ে দেবে।

৬. ভাসমান সোলার প্যানেল: আমাদের দেশে আবাদি জমির স্বল্পতা থাকায় পুকুর, হাওর বা বিলের মতো বিশাল জলাশয়ের ওপর ভাসমান সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে জমির সাশ্রয় হবে, প্যানেলগুলো শীতল থাকায় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়বে এবং পানির বাষ্পীভবনও রোধ করা যাবে।

উপসংহার: বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো নবায়নযোগ্য শক্তি এবং কৃষিভিত্তিক জ্বালানি। আমাদের সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় করতে পারলে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। অভাব যখন মানুষকে নতুন কিছু ভাবতে শেখায়, তখন বাংলাদেশের মানুষের সহজাত উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সহনশীলতাই এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় প্রধান হাতিয়ার হতে পারে।

লেখক: অধ্যক্ষ (পি.আর.এল),কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।

Share With

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *