দেশের টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে রেল যোগাযোগ একটি অপরিহার্য মাধ্যম। সাশ্রয়ী, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব হওয়ায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে এটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। সড়কপথের তুলনায় কম ঝুঁকি, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং যানজটমুক্ত যাতায়াত মানুষের মূল্যবান সময় সাশ্রয় করে।
এছাড়া রেল যোগাযোগের সম্প্রসারণ নতুন শিল্পাঞ্চল সৃষ্টি ও ব্যাপক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে কুড়িগ্রাম জেলা রেল সুবিধার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার।
জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে মাত্র চারটি—সদর, রাজারহাট, উলিপুর ও চিলমারী—রেল নেটওয়ার্কের আওতায় থাকলেও বাকি প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকা, বিশেষ করে নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী রেলপথের বাইরে রয়েছে। রৌমারী ও রাজীবপুরের চিত্র আরও হতাশাজনক।
বর্তমানে বিদ্যমান কুড়িগ্রাম-চিলমারী রেলপথের অবস্থা এতটাই জরাজীর্ণ যে ট্রেন ঘণ্টায় মাত্র ১০-১৫ কিলোমিটার বেগে চলাচল করে; ফলে ৪০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে আড়াই ঘণ্টারও বেশি।কুড়িগ্রাম বর্তমানে দেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় এখানে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না এবং বিনিয়োগকারীরাও বিমুখ হচ্ছেন। অথচ সোনাহাট স্থলবন্দরের সঙ্গে সরাসরি রেল সংযোগ থাকলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ভুটানের সঙ্গে লাভজনক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক ট্রানজিট সুবিধা অর্জন সম্ভব হতো।
একসময় ভারতের সঙ্গে কুড়িগ্রামের শক্তিশালী রেল যোগাযোগ থাকলেও বর্তমানে সেই সুযোগগুলো বন্ধ রয়েছে। জেলার সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে রেললাইনের আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক রুটগুলো পুনরায় চালু করা এখন সময়ের দাবি।
ভারতীয় উপমহাদেশে ১৮৫৩ সালে রেল যোগাযোগের সূচনা হলেও এই অঞ্চলে এর বিস্তার ঘটে ১৮৭০-এর দশকে। মূলত পাটের বাণিজ্যিক প্রসারে ১৮৭৫ সালে পার্বতীপুর-কাউনিয়া লাইন চালু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯০৮ সালে ব্রিটিশ সরকার কুড়িগ্রামে প্রথম ন্যারোগেজ রেলপথ স্থাপন করে, যা পরবর্তীতে মিটারগেজে রূপান্তরিত হয়। ১৯০১ সালে লালমনিরহাট রেলওয়ে জংশন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে কুড়িগ্রাম সেই নেটওয়ার্কের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
তৎকালীন মহকুমা শহরের যোগাযোগ সুবিধার্থে সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নে প্রথম রেলওয়ে স্টেশন স্থাপন করা হয়, যা আজও স্থানীয়দের কাছে ‘রেলবাজার’ নামে পরিচিত। তবে ধরলা নদীর ভাঙনে স্টেশনটি বিলীন হলে ১৯২৬ সালে বর্তমান পুরাতন কুড়িগ্রাম শহরের ১২ একর ৪২ শতক জমির ওপর স্টেশনটি পুনঃস্থাপন করা হয়।
ব্রিটিশ আমলে কুড়িগ্রামের রেল ব্যবস্থা যাত্রীসেবার চেয়ে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই বেশি ব্যবহৃত হতো। তখন ট্রেন ও স্টিমারে চড়ে যাত্রীরা সহজেই ভারতের ধুবড়ী বা গুয়াহাটি যাতায়াত করতে পারতেন। এমনকি কুড়িগ্রাম থেকে নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী হয়ে সোনাহাট সেতু অতিক্রম করে আসামের গোলকগঞ্জ পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করত।
তৎকালীন ‘রয়্যাল মেইল’ সার্ভিসের চিঠিপত্রও এই পথেই আদান-প্রদান হতো। আধুনিক যন্ত্রচালিত এই বাহনটি সে সময় সাধারণ মানুষের কাছে ‘লোহার রথ’ বা ‘ধোঁয়ার কল’ নামে পরিচিত ছিল।১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এই রুটে ট্রেন চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে এবং ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় আন্তঃদেশীয় এই রেল যোগাযোগগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার ঠিক আগে ১৯৬৭ সালে কুড়িগ্রাম থেকে উলিপুর হয়ে চিলমারী বন্দর পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণ করা হয়। যোগাযোগের সুবিধার্থে তখন বেলগাছা ইউনিয়নের কালে মৌজায় নির্মিত হয় ‘কুড়িগ্রাম নতুন স্টেশন’।
তবে সময়ের পরিক্রমায় ২০০৬ সালের ৩০ জুন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কুড়িগ্রামের ঐতিহাসিক পুরাতন রেলস্টেশনটি বন্ধ করে দেয়।সারাদেশে বর্তমানে ৪৪টি জেলা রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে কুড়িগ্রাম চরম বৈষম্যের শিকার। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের মতো শহরগুলো রেলের পূর্ণ সুবিধা ভোগ করলেও উত্তরের এই সীমান্তবর্তী জেলাটি এখনো অবহেলিত।
প্রায় ২৩ লাখ জনসংখ্যার এই জেলায় ঢাকা অভিমুখী একমাত্র সরাসরি ট্রেন ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’; তবে এর আসনসংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের ১৪টি কোচে মোট আসন সংখ্যা ৬২৬টি। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলার যাত্রীদের জন্য বরাদ্দ মাত্র ১৪২টি আসন । (এসি কেবিন-১২টি, এসি সাধারণ-২০টি এবং শোভন-১১০টি আসন) ট্রেনটি কুড়িগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়ার পর যে স্টেশন গুলোতে থামে সেখানকার আসন সংখ্যা কুড়িগ্রাম থেকে কাউনিয়ার জন্য ১৩৬টি, রংপুরের জন্য ১৯৬ টি, বদরগজ্ঞের জন্য ১৬ টি, পার্বতীপুরের জন্য ৫৭টি , জয়পুরহাটের জন্য ২৩টি, শান্তাহারের জন্য ৩২টি এবং নাটোরের জন্য ২৪টি আসন বরাদ্দ।ফলে মোট আসনের একটি বড় অংশ মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোর যাত্রীদের মধ্যে বণ্টিত হয়ে যায়।
এছাড়া ‘রংপুর এক্সপ্রেস’-এর সঙ্গে শাটল ট্রেনের মাধ্যমে যে সংযোগ রয়েছে, সেখানে কুড়িগ্রামের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৪০টি আসন।বিপরীতে, কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরে প্রতিদিন ২১০টিরও বেশি আন্তঃজেলা বাস চলাচল করে। ট্রেনের আসন সংকটের কারণে যাত্রীদের বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বাসে যাতায়াত করতে হয়।
স্থানীয় নাগরিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে আসন সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে কোনো কারণে বাস চলাচল বন্ধ থাকলে কুড়িগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
কুড়িগ্রামের সাধারণ মানুষের দাবি, জেলার জনসংখ্যা ও যাত্রীদের বিপুল চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে অতিদ্রুত কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করা হোক এবং রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করা হোক।
পরিসংখ্যানগতভাবে সড়কপথের তুলনায় রেলপথ অনেক বেশি নিরাপদ। ট্রেনের সময়সূচিও সাধারণত বাসের তুলনায় বেশি নির্ভরযোগ্য। ট্রেনে শৌচাগারের সুবিধা থাকে, যা বাসে অনেক সময় পাওয়া যায় না। এছাড়া অনেক ট্রেনে ডাইনিং কার বা খাবারের ব্যবস্থা থাকে, যেখানে বসে স্বাচ্ছন্দ্যে খাবার গ্রহণ করা যায়। ট্রেনের আসন বাসের তুলনায় বেশি প্রশস্ত, এবং যাত্রাপথে ভেতরে হাঁটাচলা করার সুযোগও রয়েছে। স্লিপার কোচ বা বার্থে দীর্ঘ যাত্রায় শুয়ে বিশ্রাম নেওয়া বা ঘুমানো সম্ভব, যা বাসে সম্ভব নয়।
রেলপথে যানজটের সমস্যাও নেই; ফলে দীর্ঘ দূরত্বে ট্রেন সাধারণত দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে সহায়তা করে।কুড়িগ্রামের জন্য রেল যোগাযোগের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ কেবল যাতায়াতের সুবিধা বৃদ্ধি নয়; বরং এটি এই অবহেলিত জনপদকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এর ফলে দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
বর্তমানে সোনাহাট সেতুটি টিকে থাকলেও সেখানে কোনো রেললাইন নেই। তবে কুড়িগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি—এই রেললাইনটি পুনরায় চালু করা হোক, যাতে প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং ভুটানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ আরও সহজ হয়।
লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।